অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা ও পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। মঞ্চে (বাঁ থেকে) শুচিতা শরমিন, আফজালুল বাসার, মনসুর মুসা, মোরশেদ শফিউল হাসান, সৈয়দ আজিজুল হক, মাহবুব বোরহান ও মোহাম্মদ আজম। মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে
অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা ও পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। মঞ্চে (বাঁ থেকে) শুচিতা শরমিন, আফজালুল বাসার,  মনসুর মুসা, মোরশেদ শফিউল হাসান, সৈয়দ আজিজুল হক, মাহবুব বোরহান ও মোহাম্মদ আজম। মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে

সভায় বক্তারা

আবুল কাসেম ফজলুল হক স্বপ্ন দেখতেন গণতান্ত্রিক সমাজের

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জনগণের গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। তিনি ছিলেন আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন না। ছিলেন এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের পক্ষে। সারা জীবন এসব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভেবেছেন, কাজ করেছেন।

মঙ্গলবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক-এর প্রয়াণ-উত্তর শ্রদ্ধা নিবেদন ও পর্যালোচনা সভা’ শীর্ষক আয়োজনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এ কথা বলেন।

সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছাত্র। শিক্ষকের মৃত্যু তাঁর কাছে ‘পর্বতের মতো ভারী’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল আবুল কাসেম ফজলুল হকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে। একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এ সভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী স্মৃতিচারণা করে বলেন, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ছাড়াও রাজনীতি ও জীবনের শিক্ষা পেয়েছেন তাঁর কাছে। প্রথমবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রিয় শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলেন তাঁর আশীর্বাদের জন্য।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, আবুল কাশেম ফজলুল হক ভাবতেন, রাষ্ট্র হবে জনগণের রাষ্ট্র। জনগণই হবে রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি। আর এই রাষ্ট্রের চরিত্র হবে কল্যাণকর। তিনি একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘“কোনো কোনো মৃত্যু পালকের মতো হালকা আর কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী।” আমার কাছে স্যারের মৃত্যু হিমালয় পর্বতের মতো ভারী।’

স্মৃতির আলোয় ফিরে দেখা

আলোচকদের প্রায় সবাই ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হকের সরাসরি ছাত্র বা ছাত্রসম। আর সভাপ্রধান ভাষাবিদ অধ্যাপক মনসুর মুসা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও সহকর্মী। ফলে আলোচকদের স্মৃতির আলোয় উঠে এসেছিল তাঁর শিক্ষকতার বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে তাঁর রচনা, চিন্তা, আদর্শ, কর্ম ও জীবনযাপনের বিবিধ প্রসঙ্গ।

অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক মোরশেদ শফিউল হাসান বলেন, শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। গ্রিক দার্শনিকেরা যেমন হাটবাজারে, জনসমাগম স্থানে মানুষকে শিক্ষা দিতেন, তিনিও ছিলেন অনেকটা তেমন।

অধ্যাপক ও গবেষক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন বাংলাদেশপন্থী বুদ্ধিজীবী। পরমত সহিষ্ণুতা ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ গুণ। অন্যের মত যদি তাঁর সঙ্গে না–ও মিলত, তবু তিনি বিরোধী মতের যুক্তি অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে শুনতেন। ছিলেন নির্বিরোধ স্বভাবের মানুষ। চিন্তার জায়গায় তিনি ছিলেন উদার, অসাম্প্রদায়িক, সমকালীনতার পক্ষে।

অধ্যাপক মাহবুব বোরহান বলেন, আবুল কাসেম ফজলুল হক যা বিশ্বাস করেছেন, সত্য বলে মনে করেছেন, তা বলেছেন, লিখেছেন। প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন। কে কী মনে করল বা করল না এসব নিয়ে ভাবেননি। তিনি ছিলেন অহিংসবাদী। তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, সাধনার বিষয় ছিল দেশ, দেশের মানুষ।

প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক আফজালুল বাসার বলেন, বাংলার ১৯ শতকের জাগরণ, সাহিত্য ও ইতিহাস ছিল তাঁর হাতের তালুর মতো পরিষ্কার। এ বিষয়ে পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে অধ্যাপক আহমদ শরিফ ছাড়া তাঁর সঙ্গে তুলনীয় আর কেউ নেই।

পরিবারের পক্ষে তাঁর মেয়ে অধ্যাপক শুচিতা শরমিন বলেন, শৈশব থেকে তিনি দেখেছে তাঁর বাবা সারা রাত ধরে পড়ালেখা করতেন। খুব অনাড়ম্বর সহজ জীবন যাপন করতেন। কোনো পদের লোভ ছিল না।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, যথার্থভাবেই আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদারনৈতিক ও মানবতাবাদী। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর চিন্তা ও বিশ্বাসের প্রতি অটল ছিলেন।

সভাপ্রধানের বক্তব্যে অধ্যাপক মনসুর মুসা তাঁর সহপাঠীকে হারানোর জন্য ব্যক্তিগত গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, আবুল কাসেম ফজলুল হকের সব রচনা পাঠকের কাছে সহজলভ্য করার জন্য রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৫ জুলাই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন।