রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান গতকাল শনিবার সকালে বাসা থেকে বের হন এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে। প্রথমে মহল্লার তিনটি মুদিদোকানে সয়াবিন তেলের খোঁজ করেন তিনি। না পেয়ে যান শেওড়াপাড়া বাজারে। সেখানে চারটি দোকান ঘুরে শেষে ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন কেনেন।
মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার প্রয়োজন ছিল ২ লিটারের এক বোতল। কিন্তু কোনো দোকানেই পাইনি। শেষে বাধ্য হয়ে ৫ লিটারের জার কিনেছি। তা–ও কয়েক দোকান ঘোরার পর। হঠাৎ তেলের এমন সংকট কেন হলো, বুঝলাম না।’
শুধু শেওড়াপাড়া নয়, রাজধানীর অনেক স্থানেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এখন খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম বাড়েনি। কিন্তু ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে দাম বেড়েছে। বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মাসখানেক ধরেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। গত তিন–চার দিনে এ সংকট আরও বেড়েছে। একদিকে তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তুলনামূলক কম পরিমাণে তেল বাজারে আসছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আতঙ্ক থেকে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। সব মিলিয়ে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।
গতকাল সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বেশির ভাগ মুদিদোকানে ৫ লিটারের সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও তা পরিমাণে কম। আর ১ ও ২ লিটারের বোতল হাতে গোনা দু–তিনটি দোকানে পাওয়া গেছে। পুষ্টি, রূপচাঁদা, বসুন্ধরা ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের বাইরে অন্যান্য ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল খুব একটা দেখা যায়নি।
জানতে চাইলে কৃষি মার্কেটের মুদিদোকান খোকন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তেলের অবস্থা খুব খারাপ। দু–তিন দিন আগেও ডিলারের কাছ থেকে মোটামুটি তেল পাওয়া যেত। এখন বোতলের সয়াবিন নেই বললেই চলে।’
হুমায়ুন জানান, স্বাভাবিক সময়ে তিনি ডিলারের কাছ থেকে দিনে ৮–১০ কার্টন তেল আনতেন। কিন্তু দু–তিন দিন ধরে মাত্র দু–তিন কার্টন তেল আনতে পারছেন। তা–ও আবার বেশি দাম দিয়ে।
শেওড়াপাড়া বাজারের বিক্রেতা আবদুল হাকিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অনেক ক্রেতা মনে করছেন কয়েক দিনের মধ্যে তেলের সংকট হতে পারে। এ কারণে যার এক বোতল লাগত, তিনি দুই বোতল কিনছেন। সঙ্গে ঈদের বাজারও আছে। সব মিলিয়ে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজারে সয়াবিন তেলের তিনটি ব্র্যান্ডের ডিলারের দোকানে ঘুরে দেখা যায়, এসব দোকানে বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা এসে ভিড় করছেন। বেশির ভাগ ক্রেতাই চাহিদামতো তেল কিনতে পারছেন না।
একটি ডিলারের দোকানে বসে মগবাজার এলাকার বিক্রেতা মো. পলাশের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার ৫ ও ২ লিটারের চার কার্টন করে তেল লাগত। কিন্তু ডিলার আমাকে মাত্র এক কার্টন করে তেল দিয়েছে। বলেছে, আগামীকাল (রোববার) আবার দেবে। কিন্তু রিকশা ভাড়া করে এত কম তেল নিয়ে তো পোষাবে না। আর উপায়ও তো নেই।’
গত বছরের ৭ ডিসেম্বরে সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছিল। তখন প্রতি লিটারে ৬ টাকা বাড়ানো হলে ১ লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) হয় ১৯৫ টাকা এবং ৫ লিটারের এমআরপি হয় ৯৫৫ টাকা। এরপর কোম্পানিগুলো আর এমআরপি বাড়ায়নি। তবে সম্প্রতি ডিলার বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যে দরে তেল কেনেন, সেটি বেড়েছে। তাতে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমেছে।
বিক্রেতারা জানান, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে তাঁরা এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতেন, বেচতেন ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু তিন–চার দিন ধরে তারা ৫ লিটারের বোতল কিনছেন ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করেন ৯৫৫ টাকায়। অর্থাৎ ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। তাতে খুচরা বিক্রেতাদের ৫ টাকা লাভ কমেছে। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও আগের তুলনায় ৫–১০ টাকা বেশি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের এক বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১ ও ২ লিটারের সয়াবিনের বোতল খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে কোনো কোনো বিক্রেতা এক লিটারের বোতল ২২০–২৩০ টাকা দরেও বিক্রি করছেন। অথচ এই বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৯০ টাকা।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ–সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন তেল কেজি আকারে বিক্রি হয়। গত চার দিনের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে।
গতকাল কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৯৮–২০০ টাকায়। চার দিন আগে এ দাম ছিল ১৯৩–১৯৫ টাকা। গতকাল প্রতি কেজি খোলা পাম তেল বিক্রি হয়েছে ১৭০ টাকায়, যা চার দিন আগে ছিল ১৬৫ টাকা।
ভোজ্যতেলের সরবরাহ–সংকটের বিষয়ে কারওয়ান বাজারে দুটি ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের ডিলার মো. ইয়াসিন বলেন, ‘ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো থেকে তেলের সরবরাহ কমেছে। কোম্পানি যে তেল ছাড়ছে, আমরা তার পুরোটাই বিক্রি করছি। কোনো মজুতের ঘটনা নেই। কোম্পানিগুলো সরবরাহ বাড়ালে আমরাও বেশি করে বিক্রি করতে পারব।’
তবে দেশের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সরবরাহ–সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ভোজ্যতেলের উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মিল গেট থেকে তাঁদের সরবরাহ কমেনি। তেলের উৎপাদন ও মজুতও ঠিক আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কোনো প্রভাব এখনো তেলের বাজারে পড়েনি। ফলে তাঁদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। খুচরা বাজারে কেন সংকট হয়েছে তা তিনি বলতে পারেননি।
বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ তদারকি করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘সরবরাহ–সংকটের বিষয়টি আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব।’