বিটিআরসি ভবনের সামনের ও দুই পাশের কাচের দেয়াল এবং দুই দিকের সাইনবোর্ডের কাচ ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ১ জানুয়ারি
বিটিআরসি ভবনের সামনের ও দুই পাশের কাচের দেয়াল এবং দুই দিকের সাইনবোর্ডের কাচ ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ১ জানুয়ারি

এনইআইআর চালুর প্রতিবাদে বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর

মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে চালু করা হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর)। এই পদ্ধতি চালুর প্রতিবাদে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিটিআরসি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্য ও আশপাশের দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজ বিকেল চারটার কিছু সময় পর মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করে বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনে যান। একপর্যায়ে তাঁরা বিটিআরসি কার্যালয়ের বাইরে ভাঙচুর চালান এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেও ভাঙচুর চালায়। তখন কার্যালয়ে থাকা কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

তবে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনে আর কোনো বিক্ষোভকারীকে দেখা যায়নি। তখন বিটিআরসি ভবনের সামনে সড়কে সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, র‍্যাব ও পুলিশের সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

রাস্তায় পড়ে আছে কাচের ভাঙা টুকরো

বিটিআরসি ভবনের সামনের ও দুই পাশের কাচের দেয়াল এবং দুই দিকের সাইনবোর্ডের কাচ ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভাঙা কাচের টুকরা ফুটপাতে ছড়িয়ে ছিল। ভবনের ভেতরে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেখা গেলেও হামলার ঘটনা নিয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আনসার সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, চারটার দিকে হঠাৎ কয়েক শ মানুষ বিক্ষোভ করতে করতে ভবনের সামনের আসেন। তাঁরা শ্যামলী থেকে আগারগাঁও যাওয়ার সড়কে (সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ সড়ক) অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে কার্যালয়ের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ কার্যালয়ের নিচতলায় ঢুকে ভাঙচুর চালায়।

বিটিআরসি ভবনের সামনে পড়ে আছে ভাঙা কাচের টুকরো

বিটিআরসি কার্যালয়ের পাশের ফুটপাতে খাবার বিক্রি করা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী সালাম মিয়া বলেন, বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা কয়েক শ ছিল। তাঁরা হঠাৎ এসেই ভবনটিকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। পরে সাড়ে চারটার দিকে ১০ থেকে ১৫ জন পুলিশ সদস্য নির্বাচন কমিশন ভবনের দিক থেকে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তখন আন্দোলনকারীরা তাঁদের ওপর চড়াও হন এবং পুলিশ সদস্যদের তাড়িয়ে দেন। বিকেল পাঁচটার দিকে সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন।

বিকেল চারটার কিছু সময় পর মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করে বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনে যান।

মোহাম্মদপুর সেনাবাহিনীর ২৩ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিম আহমেদ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে জানান, বিটিআরসি কার্যালয়ে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা জোরদার করতে সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

এনইআইআর পদ্ধতির বিরোধিতা করে কয়েক দিন ধরেই মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করে আসছিলেন। সরকারের অভিযোগ, এসব ব্যবসায়ীর একটি অংশ অবৈধ পথে কর ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের, ক্লোনড ও ব্যবহৃত পুরোনো ফোন দেশের বাজারে সরবরাহ করছে।

কর ফাঁকি রোধ এবং অবৈধ ও নিম্নমানের হ্যান্ডসেট আমদানি বন্ধ করতে সরকার এনইআইআর পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেয়। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে অবৈধভাবে দেশে আসা ফোন আর নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি বিদেশ থেকে অবৈধভাবে আনা পুরোনো ফোনের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যাবে।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত যেসব মুঠোফোন দেশের নেটওয়ার্কে চালু হয়েছে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা অবিক্রীত যেসব ফোনের তালিকা বিটিআরসিতে দিয়েছেন, সেগুলোও রেজিস্টার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার শুধু নতুন চালু হওয়া মুঠোফোনগুলো এনইআইআরের আওতায় আসবে। তবে সেগুলোও তাৎক্ষণিকভাবে ব্লক করা হবে না। প্রবাসীরা তাঁদের ব্যবহৃত ফোনের পাশাপাশি দুটি নতুন হ্যান্ডসেট দেশে আনতে পারবেন। এনইআইআরে নিবন্ধনের জন্য তাঁরা তিন মাসের সময় পাবেন। এই তিন মাস হ্যান্ডসেটগুলো সচল থাকবে। ভ্রমণসংক্রান্ত নথিপত্র দিয়ে এসব ফোন এনইআইআরে নিবন্ধন করা যাবে।

ওই এলাকায় সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে

হামলার আগে দুপুরে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমরা এনইআইআর চালু করেছি। ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা অবিক্রীত যেসব হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (শনাক্তকরণ নম্বর) তালিকা বিটিআরসিতে জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বন্ধ হবে না। বিদেশ থেকে যাঁরা বৈধভাবে মুঠোফোন আনবেন, তাঁরাও তিন মাস সময় পাবেন রেজিস্ট্রেশনের জন্য।’

গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থেকে এনইআইআর চালু হওয়ার কথা ছিল। ওই ঘোষণার পর থেকেই মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। ৭ ডিসেম্বর তাঁরা বিটিআরসি কার্যালয় ঘেরাও করে দিনভর সড়ক অবরোধ করেন। পরে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনইআইআর কার্যকরের তারিখ ১৫ দিন পিছিয়ে ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করে।