
কেউ বিক্রি করছেন ভুভুজেলা। কেউ বেচছেন বেলুন। আবার কেউ বসেছেন জার্সির পসরা সাজিয়ে। এসব ঘিরে চলছে ক্রেতাদের দর–কষাকষি। কেউ দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে কথা বলছেন। আবার কেউ ভাস্কর্যের নিচে দিয়েছেন ঘুম।
গত বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় অবস্থিত রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ ঘিরে এমন চিত্র দেখা গেল। সেদিন রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। টিএসসি এলাকায় বসানো বড় ডিজিটাল পর্দায় ম্যাচটি দেখতে সেদিন রাতে এসেছিলেন হাজারো দর্শক–সমর্থক। তাঁদের অনেকের জটলা ছিল রাজু ভাস্কর্য ঘিরে।
তবে এমন দৃশ্য শুধু বুধবার রাতের নয়; চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলাসহ বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে নিয়মিত বিরতিতে রাজু ভাস্কর্যের ওপর চলে আসছে এমন অত্যাচার। যেমন গত ২২ জুন বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা–অস্ট্রিয়ার ম্যাচকে কেন্দ্র করে রাজু ভাস্কর্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ছিল বুধবার রাতের চেয়েও শোচনীয়। সেই রাতে রাজু ভাস্কর্যের ওপরে উঠে পড়েছিলেন বেশ কিছু তরুণ। তাঁরা ভাস্কর্যগুলোর শরীর, মাথা, কাঁধসহ কাঠামোর ওপরে দাঁড়িয়ে ফুটবল উন্মাদনা প্রকাশ করছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শিক্ষার্থীসমাজের কাছে ‘প্রতিবাদের প্রতীক’ হিসেবে পরিচিত সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য। অন্যায়–অনিয়মসহ নানা প্রতিবাদী কর্মসূচির প্রাণকেন্দ্র এই ভাস্কর্যের পাদদেশ। কিন্তু এটি এখন অরক্ষিত অবস্থায় আছে।
১৯ জুলাই দিবাগত রাতে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। এই ম্যাচ দেখতে টিএসসি এলাকায় ফুটবলপ্রেমীদের ঢল নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেদিন রাজু ভাস্কর্যের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের চারজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় রাজু ভাস্কর্যের চারদিক ঘিরে লোহার তৈরি বেড়া ছিল। ভাস্কর্যের সামনের অংশে কনক্রিটের মেঝেতে প্রতিবাদ–বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হয়ে আসছে। তবে লোহার বেড়া অতিক্রম করে ভাস্কর্যের মূল অংশে কেউ ঢুকেছেন—এমন চিত্র অতীতে ছিল বিরল।
কিন্তু এখন ভাস্কর্যটি অরক্ষিত বলে জানান শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলছেন, রাজু ভাস্কর্যের চারদিক ঘিরে যে লোহার বেড়া ছিল, তার একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। কে বা কারা এই কাজ করেছে, তা কারও নজরে আসেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ভাস্কর্যটির এমন অরক্ষিত অবস্থা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে এটির নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন না করায় ভাস্কর্যের গায়ে শেওলা জমেছে। নিচে জমে আছে ময়লা।
ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়ে ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঈন হোসেন রাজু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। তাঁর স্মরণে ১৯৯৭ সালে টিএসসি এলাকার সড়কে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। সে বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী এ ভাস্কর্যের নকশা করেছিলেন।
এরপর তিন দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলনসহ প্রতিবাদী কর্মসূচির স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার যে আন্দোলনে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) সরকারের পতন হয়, সেই আন্দোলনের প্রথম পর্বের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কর্মসূচি পালিত হয়েছিল রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও বিভিন্ন আন্দোলন-প্রতিবাদের অন্যতম কেন্দ্রস্থল রাজু ভাস্কর্য।
ফাইনালের দিন ঘিরে উদ্বেগ
টিএসসিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত পাঁচটি স্থানে বড় ডিজিটাল পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখানো হচ্ছে। এ আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরে থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বড় পর্দায় এই খেলা দেখতে ক্যাম্পাসে আসেন। ১৯ জুলাই দিবাগত রাতে বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে টিএসসিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিপুল জনসমাগম হতে পারে বলে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ধারণা। এ প্রেক্ষাপটে সেদিন রাজু ভাস্কর্যের সুরক্ষা নিয়ে ‘উদ্বেগ’ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নও রাজু ভাস্কর্য তত্ত্বাবধান করে থাকে। সংগঠনটির একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। তাঁকে তিনি জানিয়েছেন, কিছুদিন ধরে প্রায় প্রতিদিনই লোকজন ভাস্কর্যের ওপর উঠে পড়ছে। প্রক্টর আশ্বস্ত করেছেন, ভাস্কর্যের ওপর লোকজনের উঠে পড়া ঠেকাতে তিনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা ভাস্কর্যগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য একটি কমিটি আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত প্রশাসনের সময় এই কমিটির এক বৈঠকে রাজু ভাস্কর্য সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই বৈঠকে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিমুল কুম্ভকার। তিনি বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকটি ডাকা হয়েছিল। বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে একটি সুপারিশ তৈরি করা হয়। সুপারিশ নিয়ে কার্যক্রম কিছুটা এগিয়েছেও।
ভাস্কর্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কমিটিতে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির। নির্বাচনের আগে কমিটির বৈঠকটির কথা উল্লেখ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাস্কর্যের ওপরে ওঠা ঠেকানোসহ নান্দনিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে আমাদের একটা সমন্বিত পরিকল্পনা আছে। সেখানে ভাস্কর্যের বেদির চারপাশের চত্বরটা রি–ডিজাইন (নতুন করে নকশা করা) করার বিষয়টি আছে। এ ছাড়া ভাস্কর্যে তৈরি হওয়া অনেক ফাটল সংস্কারের বিষয়ও আছে। ভাস্কর শ্যামল চৌধুরীর মেয়ে ভাস্কর রূপকল্পা চৌধুরীকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সম্প্রতি একটা ডিজাইন দিয়েছেন। সেটি আমাদের পছন্দ হয়েছে। এখন এটি এক্সিকিউট (বাস্তবায়ন) করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।’
কিন্তু ১৯ জুলাই ঘিরে ভাস্কর্যটির সুরক্ষায় কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে নাসিমুল খবির বলেন, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত ভাস্কর্যের সংস্কারের কাজ না হচ্ছে, তত দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি এটি রক্ষণাবেক্ষণ করবে। তাই এ বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজু ভাস্কর্যসহ ক্যাম্পাসে থাকা স্মারকগুলোর সুরক্ষার বিষয়টি আমাদের বিবেচনার মধ্যে আছে। ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগির এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা জানানো হবে।’
১৯ জুলাইয়ের সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা ভেবে উদ্বিগ্ন শিমুল কুম্ভকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভাস্কর্যটি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’