হাজারো মানুষের মাতমে হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র আশুরার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল। আজ শুক্রবার সকালে পুরান ঢাকায়
হাজারো মানুষের মাতমে হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র আশুরার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল। আজ শুক্রবার সকালে পুরান ঢাকায়

হোসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিল শুরু

বুকের ওপর ডান হাত রেখে মাথা নত। চারপাশজুড়ে শুধু শোকের উচ্চারণ—‘ইয়া হোসাইন, ইয়া হোসাইন’। কালো পোশাকে হাজারো মানুষের সেই মাতমে আজ শুক্রবার সকালে পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র আশুরার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল।

আজ ১০ মহররম। সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শোকাবহ একটি দিন আজ। দিনটি পবিত্র আশুরা নামে পরিচিত। হিজরি ৬১ সনের এই দিনে কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা শাহাদাতবরণ করেন। তাঁদের স্মরণে আজ সকাল ১০টায় মোগল আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনা হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে মিছিলটি বের হয়।

মিছিলে অংশ নিয়েছেন দেশের শিয়া সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ। শোকের প্রতীক হিসেবে অধিকাংশের পরনে আছে কালো পোশাক। অনেকের হাতে ছিল নিশান, আলম, দুলদুল ঘোড়ার প্রতীক, পাঞ্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক। কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে অংশগ্রহণকারীরা বুক চাপড়ে মাতম করেন এবং ‘ইয়া হোসাইন’ ধ্বনিতে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে কেরানীগঞ্জ থেকে এসেছেন আবু হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারবালার প্রান্তরে এই দিনেই ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন। ইসলামের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। তাই আজ আমাদের জন্য শোকের দিন, দুঃখের দিন, মাতমের দিন।’

প্রতিবছর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিয়ে তাজিয়া মিছিলে অংশ নেন নবাবগঞ্জের মোহাম্মদ স্বপন। এবারও এসেছেন তাঁরা। সঙ্গে ছিল তাঁর ছোট সন্তানেরাও। তিনি বলেন, ‘কারবালার ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতেই তাদের নিয়ে এসেছি। সন্তানদের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে চাই। সচেতন রাখতে চাই।’

হোসেনি দালান ইমামবাড়া মহররম মিছিল কমিটির আহ্বায়ক এম এম ফিরোজ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারবালার ইতিহাস ছিল সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)–এর জীবন উৎসর্গের ইতিহাস। আজ এই দিনে প্রার্থনা করি, সমাজ থেকে যেন সব অন্যায়–অনাচার দূর হয়। শান্তি বর্ষিত হয়।’ আগামীর প্রজন্ম যেন একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য সমাজ পায়—সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।

তাজিয়া মিছিলে অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অংশ নিয়েছেন। আজ শুক্রবার সকালে পুরান ঢাকায়

সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই, তারা সর্বাত্মক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর।’

ইমামবাড়া থেকে যাত্রা করে মিছিলটি বকশীবাজার, উর্দু রোড, লালবাগ, আজিমপুর, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাব, জিগাতলা হয়ে ধানমন্ডি লেকে যাবে। সেখানে প্রতীকী তাজিয়া বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শেষ হবে।

মিছিল শেষে বাদ জুমা হোসেনি দালানে ‘ফাকা শিকানি’ নামে পরিচিত শিরনি বিতরণ করা হবে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে ‘সামে গারিবা’ নামে বিশেষ মজলিশ। এ সময় কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার স্মরণে ইমামবাড়ার আলো নিভিয়ে শোক পালন করা হবে।

হোসেনি দালান ছাড়াও রাজধানীতে প্রায় ৩০টি ছোট-বড় ইমামবাড়া রয়েছে। মহররম উপলক্ষে এসব ইমামবাড়াতেও পৃথক তাজিয়া মিছিল, মজলিশ ও অন্যান্য ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় কাটারা ইমামবাড়া, মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদসংলগ্ন ইমামবাড়া, পুরানা পল্টন ইমামবাড়া ও মগবাজার ইমামবাড়ায়ও দিনব্যাপী কর্মসূচি রয়েছে।

তাজিয়া মিছিল নির্বিঘ্ন করতে মিছিলের সামনে ও পেছনে সোয়াটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে।