রোগী বেশি। হাসপাতালের মেঝেতে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। গতকাল রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে
রোগী বেশি। হাসপাতালের মেঝেতে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। গতকাল রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে

সরেজমিন মুগদা হাসপাতাল

ডেঙ্গু রোগীর চাপ, শিশুরাও শয্যা পাচ্ছে না

পাঁচ দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত পাঁচ বছরের ছোট্ট নাফিয়া। শীর্ণ হাতে ক্যানুলা লাগানো। চোখ দুটো লাল। শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সে। হৃদ্‌যন্ত্রেও ছিদ্র ধরা পড়েছে।

গত শনিবার রাতে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে নাফিয়াকে। শয্যা মেলেনি। তাই শিশু ওয়ার্ডের নার্স স্টেশনের পেছনে ঘুপচির ভেতর মেঝেতে তোশক বিছিয়ে তার চিকিৎসা চলছে।

নাফিয়ার মা মাহমুদা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডাক্তার সকালে দেখে বলছে, পজিশন খারাপ।’

গতকাল রোববার সকালে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলো সরেজমিনে ঘুরে রোগীর বাড়তি চাপ দেখা গেছে। শয্যার পাশাপাশি হাসপাতালের মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা চলছে। শয্যাগুলোর সঙ্গে মশারি থাকলেও সেগুলো টানানো হয়নি। অন্যদিকে মেঝেতে থাকা বেশির ভাগ রোগীর জন্য মশারির ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

প্রত্যেক রোগীর জন্য বেড নাই। কারণ, এটা ৫০০ বেডের হাসপাতাল। কাজেই অতিরিক্ত রোগীদের জন্য মোটা ফোম ও ম্যাট্রেস দিয়ে ফ্লোরে রেখে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি।
মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম, উপপরিচালক, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ডেঙ্গু রোগীদের, ১১ তলায় নারী রোগীদের এবং ৭ তলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে। তিনটি তলাতেই জেনারেল ওয়ার্ড।

৭ তলায় শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল, একই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু, হাম ও অন্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে। কাপড়ের পর্দা টানিয়ে যেনতেনভাবে ভাগ করা হয়েছে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত শিশুদের। তবে কোনটি হাম ওয়ার্ড এবং কোনটি ডেঙ্গু, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রায় সব শিশুর হাতেই ক্যানুলা লাগানো। চলছে স্যালাইন। কেউ কেউ শয্যা পেয়েছে। আর বেশির ভাগেরই ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতে। এদিকে বেশির ভাগেরই মশারি টানানো নেই।

ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা মশারি ছাড়াই কেন চলছে, জানতে চাইলে ওয়ার্ডগুলোতে দায়িত্বরত কর্মীরা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একজন নার্স দাবি করেন, বেশির ভাগ সময় টানানো থাকে। অনেক রোগী গরম লাগার কথা বলে খুলে রাখেন।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রত্যেক রোগীর জন্য বেড নাই। কারণ, এটা ৫০০ বেডের হাসপাতাল। কাজেই অতিরিক্ত রোগীদের জন্য মোটা ফোম ও ম্যাট্রেস দিয়ে ফ্লোরে রেখে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি।’

‘মাইয়া তো সুস্থ হয় না’

৯ বছরের শারিনার পাশে বসে মেয়েকে বাতাস করতে দেখা গেল বাবা আশিকুর রহমানকে। শারিনা এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। গতকাল তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উৎকণ্ঠা কাটেনি বাবার।

আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তির পর প্লাটিলেট ৩৪ হাজারে নেমে গেছিল। ডাক্তাররা ডোনার রেডি রাখতে বলেছিলেন। খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। এখন কিছুটা ভালো আছে। তবে ব্লাডপ্রেশারটা ওঠানামা করছে। এটা নিয়ে টেনশন হচ্ছে খুব।’

শিশু ওয়ার্ডের এক কোনায় মেঝেতে তোশক পেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে ১১ বছরের আয়েশাকে। এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তিন দিন আগে। তবে এখনো শয্যা মেলেনি।

মেয়ের অবস্থা জানতে চাইলে আয়েশার বাবা মো. সজীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন দিন ধইরা ভর্তি। হেরা তো কয় টেস্টফেস্ট সব ভালো। তয় মাইয়া তো সুস্থ হয় না।’

দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি

দুপুরের দিকে হাসপাতালের ১০ তলায় হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় ৬৫ বছর বয়সী আবুল হোসেনকে। তাঁর হাতে দেওয়া স্যালাইনটি বন্ধ হয়ে ছিল। শরীরে তরল ঢুকছিল না।

স্বামীকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে ছোটাছুটি করছিলেন তাঁর স্ত্রী জহুরা বেগম। স্যালাইন চালু করাতে প্রথমে তিনি যান ওই ওয়ার্ডের নার্স স্টেশনে। সেখানে বিষয়টি জানালে একজন নার্স পাশের আরেকজনকে দেখিয়ে বলেন, ‘ওটা ওপাশ থেকে দেখবে, আমরা না।’

জহুরা বেগম সেখানে গিয়ে ওই নার্সকে বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, ‘এটা তো আমার দায়িত্ব না। আমি ওতে হাত দিতে পারব না।’

এরপর আবার প্রথম নার্সের কাছে ফিরে আসেন জহুরা বেগম। এভাবে দুই নার্সের কাছে ছোটাছুটি করতে দেখা যায় তাঁকে। ঘটনাটি ঘটে এই প্রতিবেদকের সামনে।

পরে পরিচয় দিয়ে কর্তব্যরত নার্সের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে জহুরা বেগম বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমিই তো দেখব। আমি তো যাব বলেছি। কয়েকজন রোগী আছে, এদের কাজটা শেষ করেই যাচ্ছি।’ এরপর ওই নার্স দ্রুত আবুল হোসেনের কাছে গিয়ে তাঁর ক্যানুলা ঠিক করে দেন।

একই ধরনের অভিযোগ করেন আরেক রোগীর স্বজন মো. শরীফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওপর তলা থেকে এখানে আইতে কয়। হেরা কয় ওইদিকে যান, ওরা কয় হেইদিকে। আমরা যামু কই?’

তথ্য মিলছে না

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে বলা হয়, শনিবার সকাল আটটা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন।

সরকারি ওই তথ্য অনুযায়ী, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩৩ জন। বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৯।

তবে হাসপাতাল ঘুরে পাওয়া রোগীর সংখ্যার সঙ্গে সরকারি তথ্যের অমিল দেখা যায়। হাসপাতালের শুধু ১০ তলায় গতকাল কর্তব্যরত নার্সরা ৯০ জন ভর্তি রোগীর তথ্য দেন। এই প্রতিবেদক নিজেও ওই তলায় গুনে ৬০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকতে দেখেছেন।