বাসায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন নিজাম উদ্দিন। গতকাল দুপুরে রাজধানীর জোয়ার সাহারা এলাকায়
বাসায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন নিজাম উদ্দিন। গতকাল দুপুরে রাজধানীর জোয়ার সাহারা এলাকায়

‘যা বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না’

ভোরের আলো ফোটার আগেই দিন শুরু হয় নিজাম উদ্দিনের (৩৬)। রাজধানীর ভাটারা থানার জোয়ার সাহারা এলাকার একটি নয়তলা ভবনের নিরাপত্তাকর্মী তিনি। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় দায়িত্ব শুরু হয় তাঁর। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলা থেকে বছর সাতেক আগে ঢাকায় এসেছিলেন নিজাম উদ্দিন; তখন থেকেই দারোয়ানের কাজ করেন তিনি। এর আগে একটি বাসায় কাজ করেছেন। এখন সব মিলিয়ে মাসে ১২ হাজার টাকা পান নিজাম উদ্দিন।

স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে পাশের কালাচাঁদপুর এলাকায় একটি টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকেন নিজাম উদ্দিন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি তিনি। তাঁর বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর, কেবল স্কুলে যেতে শুরু করেছে। আর ছোট মেয়ের বয়স এক মাস। কালাচাঁদপুরের যে বাসায় নিজাম উদ্দিন থাকেন, সেটির ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। বেতনের বাকি সাত হাজার টাকা দিয়ে ‘টেনেটুনে’ সংসার চালাতে হয় বলে প্রথম আলোকে জানান নিজাম উদ্দিন। তাঁর ভাষায়, ‘মাছ-মাংস খাইলে খাই, না খাইলে নাই; এখন চলতে খুব কষ্ট হয়। জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। যা বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না।’

এখন যা অবস্থা, কীভাবে চলব, ট্রিপ নাই, যাত্রী নাই। সারা দিনে সব মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা থাকে। গাড়ির জমা (গাড়ির মালিককে দেওয়া ভাড়া) দিতে হয়, গ্যাস কিনতে হয়, লাইনের টাকা দিতে হয়। সব দিয়া আর কত টাকা থাকে?
আবুবকর সিদ্দিক, লেগুনাচালক

শেষ কবে নিজের আয়ের টাকায় মাংস কিনেছেন, তা মনে করতে পারেন না নিজাম উদ্দিন। বলেন, ‘৮০০ টাকা দিয়া মাংস কিনার টাকা কুলাইছে না। কেমনে কিনমু?’ নিজের জীবনমানের উন্নতির জন্য বাড়ির মালিককে বেতন বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি, তবে তার কোনো ইতিবাচক সাড়া এখনো পাননি বলে জানান।

নিজাম উদ্দিন ঢাকায় আসার আগে নেত্রকোনায় অন্যের জমিতে ফসল কাটার কাজ করতেন। নিজের কোনো জমি নেই। অবশ্য গত কয়েক বছরে ফসল কাটার কাজে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় কৃষিশ্রমিকদের চাহিদা কমছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকামুখী হন উল্লেখ করে নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘মেশিনে কম সময়ে কাজ হয় বলে আমাদের আর কেউ কাজে নেয় না।’

সড়কের পাশে বসে জুতা সেলাই করেন মাখন চন্দ্র। গতকাল দুপুরে জোয়ার সাহারা বাজারে

নিরাপত্তাকর্মীর মলিন পোশাক গায়ে জড়ানো নিজাম উদ্দিন শেষ কবে নতুন জামাকাপড় কিনেছেন, তা–ও মনে করতে পারলেন না তিনি। ভবনের বাসিন্দারা মাঝেমধ্যে পুরোনো কাপড় দেন; তা–ই পরেন। কখনো কখনো খাবারও পান। তিনি বলেন, ‘বড় মেয়ের জন্য নতুন জামা কিনলে খুশি হয়, তার জন্যই কিনি, আমার জন্য আর নেওয়া হয় না।’

‘লামছাম করে চলতে হয়’

জোয়ার সাহারা বাজারের কাছে যে বাসায় নিজাম উদ্দিন দারোয়ান হিসেবে কাজ করেন, তার পাশেই জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন ৪৫ বছর বয়সী মাখন চন্দ্র। প্রায় ২৫ বছর ধরে এ কাজ করেন তিনি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শুরু থেকেই এখানে এ কাজ করেন। তবে এখন আর আগের মতো আয়রোজগার নেই বলে জানালেন। মাসে আয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। বললেন, ‘এখন দিনে কখনো ৪০০ টাকা, কখনো ৫০০ টাকা আয় হয়।’

জোয়ার সাহারা থেকে কিছুটা দূরে বেরাইদ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন মাখন চন্দ্র। একটি টিনশেড ঘরে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। এর মধ্যে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ছয় মাস আগে। ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দিয়েছেন কয়েক দিন আগে। সব মিলিয়ে কীভাবে চলছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মাখন চন্দ্র বলেন, ‘লামছাম করে চলতে হয়। কোনোরকমে চলছে।’

‘কঠিন সময় যাচ্ছে’

প্রায় আট বছর ধরে রাজধানীর ফার্মগেট থেকে নিউমার্কেট রুটে লেগুনা চালান আবুবকর সিদ্দিক। এর আগে ফার্মগেট এলাকায় ফুটপাতে দোকান ছিল তাঁর। ৩২ বছর বয়সী আবুবকর থাকেন রাজধানীর তেজতুরী বাজার এলাকার একটি মেসে। মাসে ভাড়া আড়াই হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে ও মা থাকেন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে। তাঁদের জন্য মাস শেষে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পাঠান।

আবুবকর সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন যা অবস্থা, কীভাবে চলব, ট্রিপ নাই, যাত্রী নাই। সারা দিনে সব মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা থাকে। গাড়ির জমা (গাড়ির মালিককে দেওয়া ভাড়া) দিতে হয়, গ্যাস কিনতে হয়, লাইনের টাকা দিতে হয়। সব দিয়া আর কত টাকা থাকে?’ বর্তমানের আয়ে দিনাতিপাত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়, নিজের খরচ, সব মিলিয়ে কঠিন সময় যাচ্ছে।’