মানববন্ধন

সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বৃক্ষনিধন প্রকল্পের দরকার নেই

ধানমন্ডি-সাতমসজিদ সড়কে নির্বিচার গাছ কাটা বন্ধের দাবিতে ‘সাতমসজিদ সড়ক গাছ রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে’ মানববন্ধন। সাতমসজিদ সড়ক, ধানমন্ডি, ঢাকা, ৯ মে
ছবি: প্রথম আলো

‘প্রকল্প যদি হয় সৌন্দর্যবর্ধনের নামে গাছ ধ্বংস, এমন সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের আমাদের দরকার নেই। নগরের পরিকল্পনা যদি হয় বৃক্ষনিধনের, এমন পরিকল্পনা আর পরিকল্পনাবিদেরও দরকার নেই আমাদের।’

গাছ কাটার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সাতমসজিদ সড়কে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে এ কথা বলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ধানমন্ডি-সাতমসজিদ সড়কে নির্বিচার গাছ কাটা বন্ধের দাবিতে ‘সাতমসজিদ সড়ক গাছ রক্ষা আন্দোলনের’ ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আপনারা আপনাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করুন। টাকাপয়সা যা আছে, নিয়ে যান। শুধু গাছগুলো ফেরত দিন। যে গাছগুলো আছে, সেগুলোকে মারবেন না। আপনাদের এমন নিষ্ঠুর ও নির্দয় দৃষ্টান্ত স্থাপন আমাদের সারা জীবন মনে থাকবে। পরবর্তী প্রজন্মের যাঁরা এখানে প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছেন, তাঁরাও মনে রাখবেন। ইতিহাস আপনাদের সেভাবেই মূল্যায়ন করবে।’

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের হাতে ছিল গাছ কাটার প্রতিবাদ সংবলিত প্ল্যাকার্ড

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পেই গাছ রক্ষার চেষ্টা করা হয়। তাই সরকার সবুজায়ন আর গাছ রক্ষার যে বার্তা দেয়, তা যেন শুধু কথার কথা না হয়ে থাকে। কারণ, গাছের সংকট অতি তীব্র। একটি গাছ হারানোর মূল্যও এখন অনেক।

সাতমসজিদ সড়ক গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব বলেন, ‘দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, রাস্তার সড়ক বিভাজক মাঝখানে না থাকায় গাছ কাটতে হয়েছে। কিন্তু আমরা সাতমসজিদ সড়কের পিলখানা থেকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে সড়ক বিভাজকের দুই পাশের রাস্তা মেপে দেখেছি। বিভাজকের দুই পাশে কোনো অংশের রাস্তার প্রশস্ততায় কমবেশি পাওয়া যায়নি।’ সড়ক বিভাজকের প্রায় ৬০০ গাছ কাটা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গাছ রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আমিরুল রাজীব বলেন, ‘সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা করেনি। বাকি যে ৩৭টির মতো গাছ আছে, যেকোনো মূল্যে এই গাছগুলো রক্ষা করব।’

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্রায় আড়াই শ স্থানীয় বাসিন্দার হাতে গাছ রক্ষার বার্তা লেখা থাকা বিভিন্ন পোস্টার ছিল। এর মধ্যে ‘গাছ কেটে উন্নয়ন, এত টাকা প্রয়োজন?’; ‘নাগরিকদের কথা শুনুন, গাছ কাটা বন্ধ করুন’; ‘গাছ সব মানুষের, কাঠ শুধু ব্যবসায়ীদের’; ‘গাছ হত্যাকারী ঠিকাদারের শাস্তি চাই’; ‘গাছ বাঁচলে আমরা বাঁচব’ লেখা দেখা যায় সেসব বার্তায়।

গত ৩০ এপ্রিল গভীর রাত থেকে দ্বিতীয় দফায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সড়ক বিভাজকের গাছ আবার কাটতে শুরু করে। ওই দিন রাতেও গাছ কাটতে বাধা দেওয়া হয়। এরপর ১ মে থেকে সড়ক বিভাজকের গাছ কাটার বিরুদ্ধে লাগাতার বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে।

গাছ কাটা বন্ধের দাবিতে গত সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন শেষে আন্দোলনকারীরা নগর ভবনে দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বরাবর লেখা স্মারকলিপি মেয়রের সহকারী একান্ত সচিব নাছিরুল হাসানের হাতে দেন।

ধানমন্ডি–সাতমসজিদ সড়কে গাছ কাটা বন্ধের দাবিতে কিছুদিন ধরেই আন্দোলন চলছে

এর আগে গত জানুয়ারির শেষের দিকে ওই সড়ক বিভাজকের উন্নয়নকাজে গাছ কাটা শুরু হয়। তখন স্থানীয় বাসিন্দারা ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি দুই দিন এর প্রতিবাদ করেন। এই প্রতিবাদের মুখে গত প্রায় ৯০ দিন গাছ কাটা বন্ধ ছিল। গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ব্যক্তিদের দাবি, এ পর্যন্ত সড়কের প্রায় ৫৭০টি গাছ কাটা হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক গাছ ছিল বড়।

মঙ্গলবারের মানববন্ধনে নারীপক্ষের সদস্য সমাজকর্মী শিরিন হক, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) গণপরিবহন, গণপরিসর ও ঐতিহ্যবিষয়ক প্রোগ্রাম কমিটির সদস্যসচিব মারুফ হোসেন, স্থানীয় বাসিন্দাসহ নাগরিক ও পরিবেশ আন্দোলনকারীরা উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধন শেষে প্রতিবাদী সংগীত পরিবেশন করা হয়। এতে গান পরিবেশন করেন সমগীত ও উদীচীর শিল্পীরা।