গবেষণা সংস্থা অ্যাসেন্ড আয়োজিত ‘মূল্যহীন শৈশব-কৈশোর: শিশু নিয়োগ, প্রাপ্তবয়স্কের দায়মুক্তি ও সুরক্ষার অনভিপ্রেত মূল্য’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। ১ অক্টোবর ২০২৬
গবেষণা সংস্থা অ্যাসেন্ড আয়োজিত ‘মূল্যহীন শৈশব-কৈশোর: শিশু নিয়োগ, প্রাপ্তবয়স্কের দায়মুক্তি ও সুরক্ষার অনভিপ্রেত মূল্য’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। ১ অক্টোবর ২০২৬

আলোচনায় বক্তারা

‘কিশোর গ্যাং’–এর হোতাদের নাম প্রকাশ ও বিচারের দাবি

শিশু-কিশোরেরা অপরাধে জড়ালে বা অপরাধের শিকার হলে প্রায়ই ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি সামনে আসে। কিন্তু এসব অপরাধের নেপথ্যে থাকা হোতাদের নাম আড়ালেই থেকে যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে শিশুদের অপরাধে সম্পৃক্ত করা হোতাদের নাম প্রকাশ করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবক, সমাজ ও নীতিনির্ধারকদেরও শিশুদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। ‘মূল্যহীন শৈশব-কৈশোর: শিশু নিয়োগ, প্রাপ্তবয়স্কের দায়মুক্তি ও সুরক্ষার অনভিপ্রেত মূল্য’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এশিয়ান সোশিও-লিগ্যাল সেন্টার ফর এম্পিরিক্যাল অ্যান্ড ডকট্রিনাল রিসার্চ (অ্যাসেন্ড)। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অ্যাসেন্ডের নির্বাহী পরিচালক কে এম রাকিবুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে অ্যাসেন্ডের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক কে এম জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কিশোর গ্যাং’–এ কারা কিশোরদের সদস্য হিসেবে সম্পৃক্ত করে, সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘গডফাদাররা’ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়; তাই তাদের কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায়, তা খুঁজে বের করা জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে অ্যাসেন্ডের পরিচালক ও কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ডিন অধ্যাপক পারভেজ আহমেদ বলেন, শিশুদের অপরাধে যারা জড়ায়, সেই হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি কার্যকর সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, দেশে শিশুদের জন্য সুরক্ষামূলক আইন থাকলেও কোনো শিশুকে অপরাধে নিয়োজিত করার দায়ে কোনো প্রাপ্তবয়স্কের দণ্ড হয়েছে—এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ শিশু-কিশোর। তারা সহজেই অপরাধের শিকার বা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। অভিভাবকদের নজরদারির ঘাটতি ও মাদকের সহজলভ্যতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

অনুষ্ঠানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ তুলে ধরতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুই রিকশাচালক। কেরানীগঞ্জে রিকশা চালানো মো. ইউসুফ তাঁর চার মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানান। অন্যদিকে শ্যামপুরের রিকশাচালক নিতাই দেবনাথ জানান, তাঁর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ১০ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে কোনোভাবে কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে কি না, তা নিয়ে তিনি সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকেন।

অনলাইনে ও ধারণকৃত ভিডিও বার্তায় ২৫টির বেশি দেশের গবেষকদের পক্ষ থেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বক্তব্য দেন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সন্যাশনাল ল ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মার্ক এ ড্রাম্বল বলেন, কিশোর অপরাধের সমান্তরালে অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসাও চলে। তাই এসব চক্রে শিশুদের কারা যুক্ত করছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করা দরকার।

কলম্বিয়ার সাবেক উপ-বিচারমন্ত্রী ও ওনিয়াতির আন্তর্জাতিক আইন-সমাজতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক কামিলো উমানিয়া বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র কাজ করছে। সেসব কাজে যুক্ত করা হচ্ছে কিশোরদের। এই পরিস্থিতি থেকে কিশোরদের রক্ষায় প্রতি পর্যায়ের ব্যক্তিদের একসঙ্গে আলোচনায় বসে করণীয় ঠিক করা প্রয়োজন।

আয়ারল্যান্ডের গবেষক ক্যাথরিন নটন বলেন, শিশুদের দিয়ে অপরাধ করানোর পেছনের মূল ব্যক্তিদের নাম অবিলম্বে প্রকাশ করা উচিত।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়ানা ভালভের্দে, সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব গোথেনবার্গের প্রভাষক ও গবেষক মার্টিন জুরমান, কলম্বিয়ার মিনিস্ট্রি অব জাস্টিসের ড্রাগস নীতি বিভাগের সাবেক পরিচালক দারিও সেনদোয়া জুলুগা ও পাকিস্তানের সমাজবিজ্ঞানী জাফর ইকবাল।

অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিয়ে সেনাবাহিনীর শিক্ষা পরিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম আমিরুল ইসলাম বলেন, একটি কিশোরকে দেখভালের জন্য সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার মাধ্যমে একটি শিশুকে যদি সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না দেওয়া যায়, তাহলে চাকচিক্যময় ভবিষ্যতের আশা দিয়ে তাদের অপরাধে আকৃষ্ট করার ঝুঁকি থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি এস এম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় সঠিক তদন্তের অভাবে হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান সাইয়্যিদ শাহজাদা আল কারীম জানান, নাটক ও সিনেমায় কিশোর অপরাধ যেভাবে তুলে ধরা হয়, তা শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে শিশুদের সুরক্ষায় নীতিগত অগ্রাধিকার, নৈতিক মূল্যবোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ফাতেমা তুজ জোহরা এবং দারুল আকরাম ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম।