আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। ২৯ মে, জাতীয় চিড়িয়াখানা, মিরপুর, ঢাকা
আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। ২৯ মে, জাতীয় চিড়িয়াখানা, মিরপুর, ঢাকা

খাঁচাবন্দী মহিষ ‘ট্রাম্প’ কি শুকিয়ে গেছে, কী বলছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ

রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানার খাঁচায় জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে আলোচিত অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। এতে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, অযত্ন–অবহেলায় মহিষটি অসুস্থ কিংবা শুকিয়ে গেছে কি না?

চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, মহিষটি যথাযথ পরিবেশ পায়নি এবং কিছুটা মলিন হয়েছে। তবে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, মহিষটি সম্পূর্ণ সুস্থ আছে, ভালো আছে।

গত শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, জাতীয় চিড়িয়াখানার এল-৭ খাঁচায় রাখা মহিষটির দুই পাশে দুটি ফ্যান দেওয়া হয়েছে। ফ্যান দুটি চলছিল। মহিষটিও স্বাভাবিকভাবে খাবার খাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়াও করছে।

মহিষটির জন্য মশারির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যেখানে মহিষটিকে রাখা হয়েছে, তার ওপরে টিনের শেড রয়েছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেই শেডের নিচে ইনসুলেটর দেওয়া হয়েছে, যাতে টিন ভেদ করে তাপ কম লাগে মহিষটির গায়ে।

যা বলছেন দর্শনার্থী ও কর্তৃপক্ষ

শনিবারও অনেক দর্শনার্থী ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের আলোচিত এই মহিষ দেখতে গিয়েছিলেন চিড়িয়াখানায়। তাঁদের কেউ কেউ বলছিলেন, মহিষটির স্বাস্থ্য কিছুটা খারাপ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

সাভার থেকে এসেছিলেন মো. স্বাধীন। তিনি পবিত্র ঈদুল আজহার দিনও চিড়িয়াখানায় এসে মহিষটি দেখে গিয়েছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পেপারে (মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) যখন দেখলাম, তার চুলগুলো এলোমেলো। তার ওপরে কাক বসে আছে। এ জন্য দেখতে এসেছি।’

ঈদের দিন যেমন দেখে গিয়েছিলেন মহিষটিকে, এবার দেখে তার চেয়ে খারাপ বলে মনে হয়েছে স্বাধীনের। তিনি বলেন, এটি এখানে একাকী অবস্থায় রয়েছে। একা কোনো পশু ভালো থাকতে পারে না। মহিষটিকে যে অবস্থায় রাখা হয়েছে, তা যথাযথ মনে হয় না বলেও মনে করেন তিনি।

জাতীয় চিড়িয়াখানার খাঁচায় বিশ্রামে মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’

এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার।

মহিষটি আগের তুলনায় শুকনো দেখানোর ব্যাখ্যায় মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মহিষটিকে খামারে লালন–পালন করা হয়েছিল কোরবানির জন্য। মানে মহিষটিকে অল্প সময়ে দ্রুত মোটা করে বিক্রি করা ছিল খামারির উদ্দেশ্য। খামারি বেশি করে দানাদার খাবার খাইয়ে মহিষের শরীরে প্রচুর ফ্যাট তৈরি করেছে। মহিষ যত মোটা হবে, তার তত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকবে। হঠাৎ মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকবে। জাতীয় চিড়িয়াখানায় যেহেতু সংরক্ষণ করা হবে, সে কারণে মহিষটি যেন বেশি মোটাও না হয়, আবার চিকনও না হয়, এমন করে রাখতে হবে। মহিষটির বর্তমান বয়স সাড়ে তিন বছর। মহিষের গড় আয়ু ১৫ থেকে ২০ বছর। দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে হলে উচ্চ প্রোটিন কমাতে হবে। মহিষকে উচ্চ কার্বোহাইড্রেড দেওয়া কমাতে হবে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহিষটির কী খাওয়া উচিত, কতটুকু খাওয়া উচিত, তা ঠিক করতে ১ জুন জাতীয় চিড়িয়াখানায় মেডিক্যাল বোর্ডের বৈঠক হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অন্য কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের পরিচালক, জাতীয় চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি ও পুষ্টিবিদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী এবং মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের কর্মকর্তারা। সেই মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী, মহিষকে এখন প্রতিদিন ২৫ কেজি কাঁচা ঘাস, ৫ কেজি খড়, ৫ কেজি দানাদার খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে দেওয়া হচ্ছে।

খামারে মহিষটিকে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ কেজি করে দানাদার খাবার দেওয়া হতো জানিয়ে চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা বলছেন, এত দানাদার খাবার খাওয়ানো হলে মহিষটির অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত মোটা হওয়ার ঝুঁকিও দেখা দেয়। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে দানাদার খাবার কমিয়ে দিনে ৫ কেজি করা হয়েছে। সবুজ ঘাসের পাশাপাশি খড় যুক্ত করা হয়েছে, যাতে মহিষটির ফাইবারের প্রয়োজন মেটে।

পরিচালক বদলি, কিউরেটর সাময়িক বরখাস্ত

পবিত্র ঈদুল আজহার সময় এবার আলোচিত প্রাণী ছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটি। নামকরণের কারণে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও মহিষটি শিরোনাম হয়ে উঠেছিল।

মহিষটি নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ায় জিয়াউদ্দিন মৃধার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালন–পালন করা হচ্ছিল। জিয়াউদ্দিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, মহিষটির ‘অসাধারণ চুল’ দেখে তাঁর ভাই এর নাম রেখেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নামে।

জিয়াউদ্দিন মহিষটি বিক্রি করেছিলেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরার মনিরুজ্জামানের কাছে। ঈদের আগের দিন রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে মহিষটিকে মনিরুজ্জামানের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় চিড়িয়াখানায়। তার পর থেকে মহিষটি সেখানেই আছে।

প্রাথমিক অবস্থায় খাঁচার সামনে মহিষটির যে পরিচয় ঝুলিয়েছিল চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ, তাতে লেখা ছিল, ‘সাদা মহিষ (ডোনাল্ড ট্রাম্প)’। সেখানে ইংরেজিতে ‘অ্যালবিনো বাফেলো’ও লেখা ছিল। সেটি পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা হওয়ার পর জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদারকে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর পদ থেকে মো. আতিকুর রহমানকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক পদ থেকে মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদারকে বদলি করা হয়েছে। তাঁকে প্রাণিসম্পদ ঔষধাগারের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ ঔষধাগারের পরিচালক পদ থেকে বদলি করে মো. শাহিনুর আলমকে জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এই বদলি আদেশ জারি করা হয়।

জাতীয় চিড়িয়াখানার অন্যান্য খাঁচার সামনে দর্শনার্থী কম থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে ভিড় লেগেই থাকছে

চাকরির তিন বছর পরপর বদলি করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করে শাহজামান খান বলেন, জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক পদে রফিকুল ইসলাম প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে কারণে তাঁকে বদলি করা হয়েছে। বদলি হলেও এখনো জাতীয় চিড়িয়াখানায় পরিচালক পদ ছাড়েননি।

জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর পরিবর্তন নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, আতিকুর রহমান পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সাময়িক বরখাস্তও হয়েছেন। চাকরিবিধির শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তিনি বরখাস্ত আছেন। তিনি কী ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, তা তদন্ত করে এগুলো জানানো হবে।

রফিকুল ইসলামকে বদলি এবং আতিকুর রহমানের সাময়িক বরখাস্তের সঙ্গে মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের’ সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন শাহজামান খান।

মহিষটির নতুন পরিচয়

‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটির নতুন পরিচয় তুলে ধরেছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। গত শুক্রবার নতুন পরিচয়সংবলিত একটি সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে মহিষটির পরিচয় হিসেবে লেখা আছে, অ্যালবিনো বা সাদা মহিষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম বুবালাস বুবালিস (Bubalus bubalis)।

সাইনবোর্ডে আরও লেখা হয়েছে, অ্যালবিনো বা সাদা মহিষ মেলানিন (Melanin) উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈচিত্র্যের কারণে শরীরে সাদা রং দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের মহিষ তাদের সৌন্দর্যের জন্য বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

গত ২৮ মে মহিষটিকে কেরানীগঞ্জ থেকে নিয়ে আসে পুলিশ

সাদা মহিষ আকর্ষণীয় জিনগত বৈচিত্র্য হলেও বাণিজ্যিকভাবে দুধ বা মাংস উৎপাদনের জন্য পরিবেশের উপযোগী প্রচলিত কালো মহিষ বেশি লাভজনক ও টেকসই। সাদা মহিষ মূলত গবেষণা, প্রদর্শনী ও জিনসম্পদ সংরক্ষণের জন্য উপযোগী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সাইনবোর্ডে।

তাতে আরও লেখা হয়েছে, এই বিরল অ্যালবিনো মহিষটি আমাদের দেশের মূল্যবান প্রাণিজ জিনসম্পদের একটি অনন্য নিদর্শন। আপনার সামান্য সহানুভূতি, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক আচরণ প্রাণীটির সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ প্রদর্শনই একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়।