
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় গণগ্রন্থাগারের লাল সিরামিক ইটের সুদৃশ্য ভবনটির নিচের তলার লবিতে চলছে এক অন্য ধরনের আলোকচিত্র প্রদর্শনী। লবির ঠিক মাঝবরাবর স্টিলের কাঠামো করে তার সঙ্গে বেশ বড় আকারের আলোকচিত্রগুলো ঝুলিয়ে রাখা। সব কটি আলোকচিত্রই দেশের বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু ভবনের। কোনো কোনো ভবন যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন পরিপাটি। আবার কিছু কিছু ভবনের চারপাশে গজিয়েছে নানা জাতের গাছপালা। খানিকটা আরণ্যক পরিবেশের মাঝখান দিয়ে উঁকি দেওয়া লাল ভবনগুলোর খানিকটা আদল সৃষ্টি করছে লাল-সবুজের কাব্যিক ব্যঞ্জনা। সেটি স্থাপত্যের নান্দনিকতা আর আলোকচিত্রীর সৌন্দর্য চেতনার মিলেমিশেই সৃজিত হয়েছে। কারণ, আলোকচিত্রী নিজেও একজন স্থপতি। আর স্থাপনাগুলো দেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ স্থপতি মাজহারুল ইসলামের। তাঁর এই স্থাপত্যকর্মের ওপরে আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেছেন সুইস স্থপতি নিকলাউস গ্র্যাবার।
‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং’ নামের প্রদর্শনীটি মূলত স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে নিকলাউস গ্র্যাবারের গবেষণামূলক বই ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং: দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ (কোয়ার্ট ভারলাগ, লুসার্ন ২০২৫)-এর ছবি নিয়ে। প্রদর্শনীতে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ১০টি বিখ্যাত স্থাপনা প্রকল্পের ২৪টি ছবি রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ এই প্রদর্শনী আয়োজনে সহায়তা করেছে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভের তত্ত্বাবধায়ক সহযোগী অধ্যাপক মুহতাদিন ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, এই ছবিগুলো নিয়ে তাদের মোট ১০টি প্রদর্শনী আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রদর্শনীগুলো হবে স্থপতি মাহজারুল ইসলামের করা ওই স্থাপনাগুলোয়। জাতীয় গ্রন্থাগারে দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি হচ্ছে। এটি শুরু হয়েছে ৮ আগস্ট, আগামীকাল ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার শেষ হবে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।
নিকলাউস গ্র্যাবারের ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং: দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ বইটির ঢাকায় প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল গত ২৫ এপ্রিল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশে। এরপর এই ছবিগুলো নিয়ে প্রথম প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। আয়োজকেরা জানান পর্যায়ক্রমে সুবিধামতো সময়ে বাকি প্রদর্শনীগুলো করা হবে। তৃতীয় প্রদর্শনীটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চতুর্থটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় জনপ্রশাসন ইনস্টিটিউট (নিপা), কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার, জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (বগুড়া, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বরিশাল)—এই ১০টি প্রকল্পের ২৪টি আলোকচিত্র রয়েছে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের (১৯২৩-২০১২) কাজ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে নিকলাউস গ্র্যাবার বলেছেন, তিনি তাঁর কাজে বাংলাদেশে এমন এক অসামান্য স্থাপত্য ঐতিহ্য রেখে গেছেন, যার প্রাসঙ্গিকতা সময় ও ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে পৌঁছেছে। তাঁর এসব যুগান্তকারী ও কালজয়ী কাজগুলোয় তিনি বাস্তববাদ ও কাব্যিকতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যে স্থাপন করতে পেরেছেন।
নিকলাউস গ্র্যাবার দীর্ঘদিন থেকে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ও বাংলাদেশের স্থাপত্যকর্ম নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করছেন। স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে বইটিতে তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনার পাশাপাশি অনন্য স্থাপত্যকর্ম তুলে ধরতে বহু আলোকচিত্র এবং মূল নকশার বিস্তারিত প্রতিলিপি উপস্থাপন করেছেন। প্রদর্শনীতে বইটিও উপস্থাপন করা হয়েছে।
নিকলাউস গ্র্যাবারের একজন সুইস স্থপতি। তিনি ইটিএইচ জুরিখ এবং নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে অবস্থিত ‘গ্র্যাবার অ্যান্ড স্টাইগার আর্কিটেক্টস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। পাশাপাশি লুসার্ন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসে শিক্ষকতা করেছেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকার বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টসে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন।
নিকলাউস গ্র্যাবার বাংলাদেশের স্থাপত্যজগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। গবেষণার জন্য তিনি বহুবার বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও এর স্থাপত্য বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে এ বিষয়ে প্রকাশনাকাজের পাশাপাশি বক্তৃতা দিয়ে আসছেন।