দেশ বাঁচাও, বন্দর বাঁচাও আন্দোলন আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেন লক্ষ্মীপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য সাহাদাত হোসেন। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা। ৭ জুন ২০২৬
দেশ বাঁচাও, বন্দর বাঁচাও আন্দোলন আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেন লক্ষ্মীপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য সাহাদাত হোসেন। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা। ৭ জুন ২০২৬

জাতীয় স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা না দেওয়ার দাবি

চট্টগ্রামের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ বন্দরটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত। কাজেই এই বন্দর কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া যাবে না।

আজ রোববার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার চুক্তির প্রতিবাদে ‘দেশ বাঁচাও, বন্দর বাঁচাও আন্দোলন’ এই সভার আয়োজন করে। সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকা শক্তি চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অবিলম্বে বিএনপি সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর ও মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বর্তমান সরকারের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’।

লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম সভায় বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর যাঁরা পরিচালনা করছেন, এই মুহূর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তাঁরা প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করেছেন। আমাদের বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, তবে তার জন্য দেশীয় লাভজনক প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি করেছে উল্লেখ করে তিনি দেশ ও জনস্বার্থে ইজারা চুক্তি কার্যকর না করার আহ্বান জানান।

শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। আমরা জনস্বার্থ রক্ষার জন্য জন্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাব।’

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের অর্থনীতির চালিকা শক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সামরিক দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এর সন্নিকটে রয়েছে। কোনো অজুহাতেই এই বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়া যাবে না। এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। জনগণের স্বার্থে তাদের শক্ত ভূমিকা নিতে হবে।’

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গণবিরোধী চুক্তিগুলো সংসদে উত্থাপন করে অংশীজনদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তিতে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর বড় আঘাত আসবে। আগের কর্তৃত্ববাদী সরকার এই চুক্তিগুলোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, পরে অন্তর্বর্তী সরকার তা সম্পন্ন করে। কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের এসব চুক্তি কার্যকর করার কোনো দায়বদ্ধতা নেই।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড নামের যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্দর পরিচালনার চুক্তি হয়েছে, তাদের সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ সহযোগিতার চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির সূত্রে মার্কিন নৌবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দর তাদের প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করতে পারবে। কাজেই বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দীন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘এই সরকার “সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। কাজেই দেশের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা তাদের কর্তব্য। দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল করে সকল অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ করতে হবে।’

গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য সৈয়দ হাসান মারুফ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক। এই বন্দর জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভরশীল। নির্দিষ্ট মাপের চেয়ে বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। কাজেই উন্নয়নেরও খুব বেশি সুযোগ এখানে নেই। সেই সুযোগ গভীর সমুদ্রবন্দরে রয়েছে। এসব বিভিন্ন বাস্তবসম্মত কারণে এই চুক্তি বাতিল করতে হবে।’

বিএনপি নেতা রাশেদ খান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ষড়যন্ত্রমূলক কাজ করেছে। তারাই এই চুক্তিটি করেছে। এর জন্য বিএনপির কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এখনো একটি চক্র দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে ‘দেশ বাঁচাও বন্দর বাঁচাও আন্দোলন’–এর সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই এই বন্দরটি পরিচালিত হচ্ছে। পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কোনো অভিযোগ নেই। বন্দরটি দেশের অন্যতম আয়ের উৎস। এসব দিক বিবেচনা করলেও এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। জাতীয় স্বার্থেই এই দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে।’

সভায় আরও বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী আবুল হাসান। সভাটি সঞ্চালনা করেন মোমিনুল আমিন।