মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় খালের ইউটার্ন আকৃতির অংশ আবর্জনায় ঠাসা। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি
মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় খালের ইউটার্ন আকৃতির অংশ আবর্জনায় ঠাসা। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি

টাকা ‘ঢাললেও’ খালে পানি থাকে না

গত পাঁচ অর্থবছরে খাল খনন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার, উন্নয়ন ও সীমানা নির্ধারণে ঢাকা উত্তর সিটির ব্যয় প্রায় ১৯২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা

মেয়র কিংবা প্রশাসক—যখন যে ব্যক্তি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নেন, তিনি শুরুতেই বেদখল হওয়া খাল উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন। খালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কথাও বলেন। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে খাল সংস্কারের কথা বলেছেন ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান।

তবে গত দুই দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যত প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হোক না কেন বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতি বছর বিভিন্ন খালের কোনো না কোনো অংশ দখল হয়। আবার পরিকল্পিত সংস্কারের অভাবে আবর্জনা জমে অনেক জায়গায় খাল ভরাট হয়ে যায়।

ঢাকা উত্তর সিটির বার্ষিক ব্যয়ের বিবরণ অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) খাল খনন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার, উন্নয়ন ও সীমানা নির্ধারণে খরচ হয়েছে প্রায় ১৯২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

এত টাকা ব্যয়ের পর ঢাকা উত্তর সিটির খালগুলোর এখন কী অবস্থা, তা গত ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ—এই তিন দিন সরেজমিন দেখেছে প্রথম আলো। ঢাকা উত্তর সিটিতে খাল রয়েছে ৩২টি। এর মধ্যে ১৫টি খালের বিভিন্ন অংশ (প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা) পরিদর্শন করেছেন প্রথম আলোর একজন প্রতিবেদক। এর মধ্যে সাতটি খালের বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। কোথাও গৃহস্থালি বর্জ্য, কোথাও পলিথিন-প্লাস্টিকের বর্জ্য স্তূপ হয়ে এসব খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু জায়গায় খালের পাড়ে অবৈধ স্থাপনা চোখে পড়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে আটটি খাল। তবে এসব খালের পানির রং ঘন কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত।

প্রতিটি খাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনামাফিক কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।
শফিকুল ইসলাম খান, প্রশাসক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

ঢাকা উত্তর সিটির নতুন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে খাল উদ্ধার ও আবর্জনা পরিষ্কার করা নিয়ে কী হয়েছে, এ বিষয়গুলোর জবাব দিতে পারব না। আমি কী করতে চাই, আমি কতটুকু করতে পারব, সেটা আমি বলতে পারব। প্রতিটি খাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনামাফিক কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।’

উত্তরে ৩২ খাল

ঢাকা উত্তর সিটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাল মিরপুরে—১৪টি। এই খালগুলো হলো রূপনগর, বাউনিয়া, দ্বিগুণ, বাইশটেকী, সাংবাদিক কলোনি, মুসলিম বাজার, প্যারিস, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর মূল খাল এবং ক, খ (গোদাগাড়ী), ঘ (বগার-মা), ঙ ও চ খাল।

বাকি খালগুলোর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুরের  রামচন্দ্রপুর, কাটাসুর, লাউতলা উত্তর ও লাউতলা দক্ষিণ খাল। উত্তরা এলাকায় রয়েছে আবদুল্লাহপুর খাল (খিদির খাল), দিয়াবাড়ি ও কসাইবাড়ি খাল।

এ ছাড়া বাড্ডায় শাহজাদপুর খাল, সুতিভোলা-১ (আফতাবনগর-বসুন্ধরা ১০০ ফুট) ও ২ (সাঁতারকুল-রামপুরা) খাল। তেজগাঁও-মহাখালী এলাকায় বেগুনবাড়ি ও মহাখালী খাল রয়েছে। আর উত্তর সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ডুমনি-পঞ্চাতি, বোয়ালিয়া, গোবিন্দপুর, নরাই, মেরুলখোলা ও হোতাপাড়া খাল। ঢাকা উত্তর সিটিতে এখন ওয়ার্ড আছে ৫৪টি। আগে ছিল ৩৬টি। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে নতুন করে ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হয় ঢাকা উত্তর সিটিতে।

মিরপুরের রূপনগর খাল দখল করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি

কী দেখা গেল

প্রথম আলো যে ১৫টি খালের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেছে, সেগুলো হলো রূপনগর, প্যারিস, রামচন্দ্রপুর, কাটাসুর, আবদুল্লাহপুর, কল্যাণপুর মূল, কল্যাণপুর-চ, বাউনিয়া, ইব্রাহিমপুর, দিয়াবাড়ি, কসাইবাড়ি, দ্বিগুণ, কল্যাণপুর-খ (গোদাগাড়ী), কল্যাণপুর-ঘ (বগার-মা) এবং খিলক্ষেতসংলগ্ন বোয়ালিয়া খাল। এর মধ্যে প্রথম সাতটি খালের  বেশির ভাগ অংশে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই।

মোহাম্মদপুরে রামচন্দ্রপুর খালের দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটারের কিছু বেশি। এই খালের প্রস্থ কোথাও ১৫ মিটার, কোথাও ২৫ মিটার। খালটির শুরু মোহাম্মদী হাউজিংয়ের ৫ নম্বর সড়ক থেকে। পরে শেখেরটেক, শ্যামলী হাউজিং ও আদাবর এলাকা পেরিয়ে কল্যাণপুর মূল খালে মিশেছে।

২৭ ফেব্রুয়ারি খালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। খালটির শুরুর প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ মোটামুটি পরিচ্ছন্ন, পানির প্রবাহও আছে। কিন্তু শ্যামলী হাউজিংয়ের ‘হাক্কার গলি’ অংশে পৌঁছাতেই বদলে যায় দৃশ্য। খালের এই অংশে জমে আছে গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পলিথিন। আবর্জনার কারণে খালের এই অংশে পানির প্রবাহ আছে কি না, তা অনুমান করা কঠিন। হাক্কার গলি থেকে সামনে এগোলে বর্জ্যের স্তূপ আরও ঘন হতে দেখা যায়। আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়কের কাছে খালটি ইউ আকৃতিতে বাঁক নিয়েছে। এই বাঁকের জায়গাটিতে বর্জ্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কোথাও কোথাও বর্জ্য ও মাটি জমে খাল প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।

শ্যামলী হাউজিংয়ের বাসিন্দা শাহাদত হোসেন বলেন, রামচন্দ্রপুর খালের এই অংশ (ইউ আকৃতিতে বাঁক) ময়লার ভাগাড় হয়ে আছে। এখানে অনেক দিন খাল সংস্কার করা হয়নি। খালের পানির দুর্গন্ধে জানালা খোলা রাখা যায় না। আর ভারী বৃষ্টি হলেই খালের পানি উপচে পড়ে।

খালে ভাসছে প্লাস্টিকের সামগ্রী

ডিএনসিসির তথ্য অনুযায়ী ইস্টার্ন হাউজিং, দুয়ারীপাড়া, চিড়িয়াখানা, আরামবাগ আবাসিক ও রূপনগর আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া খালটি রূপনগর খাল নামে পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ কিলোমিটার। এই খাল প্রস্থে ৫ থেকে ১৫ মিটার। চলতি অর্থবছরে দুই ধাপে খালের বর্জ্য অপসারণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি। প্রথম ধাপে খালের ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার এলাকা থেকে বর্জ্য অপসারণে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে খালের আরও ৯০০ মিটার এলাকা পরিষ্কারে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয় ৯ কোটি টাকা বেশি।

রূপনগর আবাসিক এলাকার শেষ প্রান্তে এই খালের ওপর সেতু আছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, খালে ভাসছে প্লাস্টিক ও নানা ধরনের বর্জ্য। সেখান থেকে সামনে এগোলে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দারা খালের পাড়েই গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলছেন। রূপনগরের ৩৯ নম্বর সড়কে জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমির পেছনে খালের পাড়ে বাঁশ পুঁতে মাচা তৈরি করে টিনের ছাউনির বস্তিঘর নির্মাণ করে দখল করা হয়েছে।

ভরাট করে ঘর নির্মাণের চেষ্টা

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টার উপস্থিতিতে মিরপুরের বাউনিয়া খালে লালগালিচা বিছিয়ে সংস্কার ও খননকাজের উদ্বোধন করা হয়েছিল। ঢাকা উত্তর সিটির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর ডেন্টাল কলেজ থেকে কালশী স্টিল ব্রিজ পর্যন্ত খালের ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশে সংস্কারকাজ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ কিলোমিটার হলেও বাজেটস্বল্পতায় বাকি অংশের সংস্কারকাজ এখনো শুরু করেনি ডিএনসিসি।

সংস্কারের পর খালের ভাসমান বর্জ্য কমেছে। খাল গভীর হয়েছে। পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে তিন উপদেষ্টা খালের যে জায়গায় খননযন্ত্রে উঠেছিলেন, সেই অংশে বাঁশের সাঁকো করা হয়েছে। সেখানেই জমছে ময়লা-আবর্জনা। পাশেই বাঁশের খুঁটি পুঁতে খাল ভরাট করে ঘর নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। একটু দূরেই আরেক জায়গায় পাড়ে বাঁশ ও সিমেন্টের খুঁটি তুলে খাল ভরাটের কাজ চলছে।

বাউনিয়া খালপাড়ের বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, চোখের সামনেই খাল দখলের পাঁয়তারা চলছে, কিন্তু সিটি করপোরেশনের খোঁজ নেই।

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার

ঢাকা উত্তর সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ৫টি খালের বর্জ্য অপসারণ ও খনন (প্রায় ১৫ দশমিক ২৩ কিলোমিটার) কাজ হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রূপনগর খালে মিরপুর বেড়িবাঁধ স্লুইসগেট থেকে ঢাকা কমার্স কলেজ কালভার্ট পর্যন্ত দুই দফায় খালের ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার অংশে বর্জ্য অপসারণ ও খননকাজ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মিরপুর ডেন্টাল কলেজ থেকে কালশী স্টিল ব্রিজ পর্যন্ত বাউনিয়া খালের ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার, কসাইবাড়ি খালে ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার, কল্যাণপুর (আগারগাঁও) মূল খালে ২ দশমিক ৪২ কিলোমিটার এবং কল্যাণপুর-ঘ খালে ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে।

প্রতিবছর রুটিন কাজ না করে খালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রাখার জন্য সিটি করপোরেশনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে মনে করেন নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দখল-দূষণের পেছনের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চক্র রয়েছে, তা ভেঙে দিতে হবে। একই সঙ্গে খাল রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদের কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।