এলপিজি সিলিন্ডার
এলপিজি সিলিন্ডার

রান্নার জন্য মানুষ দোকানে দোকানে খুঁজছে এলপিজি সিলিন্ডার, পেলেও দাম চড়া

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা থাকলেও এলাকার খুচরা দোকানগুলোয় মিলছে না বাসাবাড়িতে বেশি ব্যবহৃত এ গ্যাসের সিলিন্ডার। ফলে দোকানে দোকানে ঘুরছেন গ্রাহকেরা। আবার কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। অনেককেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। শনিবার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গ্রাহকদের এমন ভোগান্তি দেখা গেছে।

আজ সকাল ১০টার দিকে কথা হয় মিরপুরের কালশীর সাংবাদিক আবাসিক এলাকার ৫ নম্বর সড়কের ১২৭ নম্বর বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণকারী মনির মিয়ার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, সকালে ওই বাড়ির সাততলার এক ভাড়াটের এলপিজি ফুরিয়ে যায়। নিয়মিত যেসব দোকান থেকে সিলিন্ডার আনা হয়, এমন তিনটি দোকানে তিনি মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। প্রতিটি দোকান থেকেই জানানো হয়, সিলিন্ডারের সরবরাহ নেই। তিনি বিষয়টি ভাড়াটেকে জানান।

মিরপুর মুসলিম বাজার এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির একটি দোকান। সেখানে এখন পড়ে আছে অনেকগুলো খালি সিলিন্ডার। ৩ জাুনয়ারি

মনির মিয়া বলেন, গ্যাস না পেয়ে সকালে হোটেল থেকে ওই ভাড়াটেকে নাশতা এনে দিতে হয়েছে। বেশি টাকা দিলে গ্যাসের সিলিন্ডার দিতে পারবে—এমন কোনো দোকানি বলেছেন কি না, জানতে চাইলে মনির মিয়া বলেন, ‘সিলিন্ডারই নাই, বেশি টেকা দিলেই উপায় কী? কইতে (কোথা থেকে) দিব হেরা (দোকানি)?’

মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের এফ ব্লক ও মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকের বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাস দেন বিনিময় ট্রেডার্সের মালিক হাসান মাহমুদ। সকালে তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা, ইউনিগ্যাস, পেট্রো ও সেনার এলপিজি গ্যাস বিক্রি করি। কিন্তু প্রায় ১০ দিন ধরে এসব কোম্পানির ডিলাররা (পরিবেশক) কোনো গ্যাস (সিলিন্ডার) দিচ্ছে না।’

হাসান মাহমুদের ভাষ্য, প্রতিদিন তিনি ১৫ থেকে ২০টি সিলিন্ডার বিক্রি করতেন। এখন দোকানে একটি সিলিন্ডারও নেই। গতকাল বড় দোকানিদের কাছ থেকে তিনটি সিলিন্ডার এনে প্রতিটি দুই হাজার টাকা বিক্রি করেছেন। তবে সেগুলো ক্রেতাদের কাছে অনুমতি নিয়ে। আজ বেশি দামে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন বলেও জানান তিনি। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিলাররা বাড়তি দামে বেচার কোনো রসিদ দিচ্ছে না। কাস্টমারও নানান প্রশ্ন করেন। তাই আর বিক্রি করছি না।’

মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেকশনের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পাইকারিতে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করে স্পার্ক এনার্জি সলিউশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একজন বিক্রয় প্রতিনিধি প্রথম আলোকে জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তাঁরা স্বাভাবিক সরবরাহ পাচ্ছেন না। আগে এক চালানে কোম্পানিগুলো থেকে ১২ ও ৩৫ কেজির ১৫০ থেকে ২০০টি সিলিন্ডার পাওয়া যেত। এখন একই পরিমাণ চাহিদা পাঠালেও দেওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২০টি। সরবরাহ না করার কারণ হিসেবে জানানো হচ্ছে, গ্যাসের মজুত নেই।

মিরপুর সি ব্লকের একটি দোকানেও পড়ে আছে খালি সিলিন্ডার

যে অল্প কিছু সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর দামও প্রস্তুতকারক পর্যায় থেকেই বাড়তি নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন এই বিক্রয় প্রতিনিধি। তবে সরবরাহকারী পর্যায়ে ঠিক কত দামে গ্যাস কেনা হচ্ছে—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, মালিক ব্যাংক চালানের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করেন।

একই চিত্র শেওড়াপাড়াতেও। ওই এলাকার বাসিন্দা আহমেদ সজীব বলেন, বুধবার রাতে গ্যাস শেষ হওয়ার পর নিয়মিত যে দোকান থেকে সিলিন্ডার নেন, সেখানে ফোন করেন। গ্যাস নেই বলে জানানো হয়। পরে গ্যাসের জন্য কয়েকটি দোকান ঘুরেও পাননি। শেষে একটি দোকান থেকে দুই হাজার টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার কেনেন।

সজীব অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে এর কোনো তদারকি নেই। ১ হাজার ২৫০ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। আগে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিত, এখন সেটি ৭ থেকে ৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।’

শেওড়াপাড়ার আরেক বাসিন্দা নীরব খান জানান, শুক্রবার রাতে রান্নার সময় তাঁর বাসার গ্যাস শেষ হয়ে হয়। দোকানে ফোন করা হলে জানায়, গ্যাস নেই। রাজি থাকলে অন্য দোকান থেকে বেশি দামে এনে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। দাম বলা হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত তিনি এক আত্মীয়র কাছ থেকে সিলিন্ডার ধার নিয়ে কাজ চালাচ্ছেন বলেও জানান।

মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও খুচরা দোকানগুলোয় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। বিক্রেতারা জানান, সরবরাহকারীরা সিলিন্ডার দিচ্ছেন না। শেখেরটেক এলাকার দোকানি রমিজ আলী বলেন, আজকেও অনেকে ফোন করেছেন। গ্যাস নেই বলে জানাতে হয়েছে। অনেকে বিশ্বাস না করে দোকানেও এসে দেখে গেছেন।

শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা সিয়াম হোসেন বলেন, গ্যাস না থাকায় রাতে বাসায় স্বাভাবিক রান্না করা সম্ভব হয়নি। সময়মতো খাবার প্রস্তুত করা যায়নি, বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়েছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ভোগান্তিও বেড়েছে।

গৃহস্থালির রান্নায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের ভোক্তা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী, এর এক টাকা বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবে সংকটের সুযোগ নিয়ে দেদার দাম বাড়ানো হলেও তদারকি নেই বলেই অভিযোগ গ্রাহকদের।

এদিকে ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ (২৪/৭) খোলা রয়েছে। অনলাইনে www.dncrp.com-এ অভিযোগ করা যায়।