চিকি’সক কক্ষের সামনে আড়াই বছর বয়সী ছেলে আবু সাঈদকে কোলে নিয়ে বাবা মোহাম্মদ সেলিম। ২২ মার্চ
চিকি’সক কক্ষের সামনে আড়াই বছর বয়সী ছেলে আবু সাঈদকে কোলে নিয়ে বাবা মোহাম্মদ সেলিম। ২২ মার্চ

পঙ্গু হাসপাতালে ৯ ঘণ্টায় চিকিৎসা নিলেন ১১৪ জন, ভর্তি ২২

রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজারের আজিজ খান সড়ক এলাকা। বাসার সামনেই রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মা নাজমা বেগম। আর বিপরীত পাশে কয়েকজন সমবয়সী শিশুর সঙ্গে খেলছিল তাঁর আড়াই বছর বয়সী ছেলে আবু সাঈদ। হঠাৎ দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা দেয় সাঈদকে। এতে সাঈদের মুখে, মাথায় ও পায়ে আঘাত লেগেছে। এরপরই তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন মা-বাবা।

আজ রোববার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সাঈদকে কোলে নিয়ে বসে আছেন বাবা মোহাম্মদ সেলিম। চিকিৎসক দেখানোর অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে শিশুটির দুই পা সোজা করে ধরে রেখেছেন মা নাজমা বেগম। সাঈদের নাক ও মুখে তখনো রক্তের দাগ স্পষ্ট।

দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘এমন যদি হয়তো আমার পোলা হটাসে রাস্তায় দৌড় দিসে—তাইলেও মনরে বুঝাইতে পারতাম। ছেলের কোনো দোষই নাই। সে রাস্তার পাশে খেলছিল। তখন এত্ত জোরে রিকশা চালাইয়া আইসে যে থামাইতেই পারে নাই।’

দুর্ঘটনার পর অটোরিকশাচালক ঘটনাস্থলেই গাড়ি রেখে পালিয়ে যান বলে জানান সেলিম। তিনি বলেন, তাঁরা দ্রুত ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ছেলের মাথার এক্স-রে করা হয়েছে।

হাসপাতালটির চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটির আঘাতের অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী চিকিৎসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চিকিৎসক কক্ষের সামনে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। ২২ মার্চ

ঈদের ছুটিতে সড়কে যানবাহনের চাপ কম থাকায় ঈদ আনন্দ উদ্‌যাপন করতে গিয়ে অনেকেই বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালিয়ে থাকেন। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘটে অনেক দুর্ঘটনা। আজ রোববার বিকেলে পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, কিছুক্ষণ পরপরই অ্যাম্বুলেন্সে করে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের আনা হচ্ছে। কারও হাত-পা ভেঙে গেছে, কারও মচকেছে, আবার কেউ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। চিকিৎসকের কক্ষের সামনে রোগী ও স্বজনদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁরা বলছেন, বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর কারণে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আজ সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ১১৪ জন রোগীকে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৮৬ এবং নারী ২৮ জন। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর আঘাতের ধরন অনুযায়ী ২২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের দিন গতকাল শনিবার ২৬৯জনকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।

জরুরি বিভাগে আহত ব্যক্তি ও স্বজনেরা। ২২ মার্চ

ওই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে মাদারীপুরের রাজৈরের বাসিন্দা জনি খানকে। ঈদের বন্ধে বাড়ি গিয়েছিলেন তিনি। ঢাকায় কারওয়ান বাজারে একটি মাংসের দোকানে কাজ করেন। অটোরিকশার ধাক্কায় তাঁর ডান পা হাঁটুর নিচে ভেঙে গেছে।

ভাইয়ের দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রাজন খান বলেন, ১১টার দিকে ভাই গ্রামের পাশে একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দ্রুতগতিতে আসা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁর পায়ে এসে জোরে ধাক্কা দেয়।

অটোরিকশার দুর্ঘটনায় আঘাত পেয়েছেন সিরাজগঞ্জের সোলেমান প্রামাণিককে। তবে তিনি নিজে রিকশা চালাচ্ছিলেন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেই পড়ে গিয়ে ডান পায়ের গোড়ালিতে আঘাত পেয়েছেন। স্বজনেরা জানান, সোলেমানের পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রড লাগাতে হবে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

সম্যসার কথা শুনে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ২২ মার্চ

সেখানে কথা হয় সোলেমানের ছেলে শফিকুল প্রামাণিকের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সকালে বাজার থেকে একটি হাঁস কিনে বাড়ি ফিরছিলেন তাঁর বাবা। হঠাৎ হাঁসটি রিকশা থেকে উড়াল দেয়। হাঁসটিকে ধরতে গিয়ে রিকশার নিয়ন্ত্রণ হারান তাঁর বাবা। রিকশা উল্টে তাঁর বাবার পায়ের ওপর পড়ে যায়।

জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক অপু মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি কিংবা টমটমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। কিছু প্রাইভেট কার দুর্ঘটনাও রয়েছে। রোগীর আঘাতের ধরন অনুযায়ী কাউকে কাউকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর ফলোআপে আসতে বলা হচ্ছে।