‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৮ জুলাই ২০২৬
‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৮ জুলাই ২০২৬

আহমদ ছফার কবরের জায়গা পেতে ঘুষ দিতে হয়েছিল: সলিমুল্লাহ খান

আহমদ ছফার সঙ্গে তুলনা করার মতো লেখক বাংলা সাহিত্যে আর নেই বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। এত বড় লেখক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে আহমদ ছফা বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবর পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সলিমুল্লাহ খান বলেন, আহমদ ছফা যখন মারা যান, তখন দেশে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। কিন্তু সে সময় সদ্য সাবেক আওয়ামী লীগ আমলের ব্যক্তিরাই কবরস্থানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তাঁরা আহমদ ছফাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবর দিতে দেননি।

এ প্রসঙ্গে এই লেখক ও অধ্যাপক আরও বলেন, ‘২০০১ সালের ২৮ জুলাই আহমদ ছফা মারা যান। তাঁকে কবর দিতে গিয়ে আমরা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলাম। যে আহমদ ছফা ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন বলা যায়, সেই আহমদ ছফাকে কবর দিতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়েছে, তুরাগের তীরে (ঢাকার মিরপুর এলাকা) একটা কবরের জায়গা পেতে।’

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে ‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে সলিমুল্লাহ খান এসব কথা বলেন। আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এ বছরও এই বক্তৃতার আয়োজন করে ‘আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা’ এবং ‘এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা’।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আহমদ ছফার কবর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক বললেন, আহমদ ছফার কবরটা তো বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দেওয়া উচিত। তখন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার আবেদন করলেন। সেটা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, দুই বছর ধরে লড়াই চলছে।’

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আমি এটা জানতাম না যে এর জন্য গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়, তারপর সিটি করপোরেশন কাজটা করবে। আবার ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকেও অনুমতি নিতে হয়। এই সব নিয়ে এখনো কাজটা সম্পন্ন হয়নি।’

এবারের আহমদ ছফা স্মৃতি বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘আহমদ ছফার স্মৃতি না বিকৃতি?’। বক্তা ছিলেন আহমদ ছফা রচনাবলির সম্পাদক ও তাঁর ভাতিজা নূরুল আনোয়ার। বক্তৃতায় আহমদ ছফাকে নিয়ে সম্প্রতি মহিউদ্দিন আহমদের লেখা স্মৃতিচারণামূলক বই ‘আমার কথা কইবে পাখি’–এর কড়া সমালোচনা করে বলা হয়, ‘এই বইয়ে আহমদ ছফাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। আহমদ ছফাকে নিয়ে বিকৃতভাবে কিছু গল্প বানিয়েছেন মহিউদ্দিন।’ এই বইয়ের জবাবে নিজেও উপন্যাসের ঢঙে একটি বই লিখেছেন বলে উল্লেখ করেন নূরুল আনোয়ার।

পরে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানও তাঁর বক্তব্যে মহিউদ্দিন আহমদের ওই বইয়ের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘মহিউদ্দিন আহমদ নূরুল আনোয়ারকে ফোন করে বলেন, “আমি তো জানতাম না আহমদ ছফার কবর কোথায়”। আহমদ ছফাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবর দিতে দেওয়া হয়নি, তা মহিউদ্দিন আহমদ জানতেন না। অথচ তিনি তাঁর ওপর একটা বই লিখে বসেছেন। তাতে লেখকের ইনঅথেটিনটিসিটির (কৃত্রিমতা) প্রমাণ পাওয়া যায়।...আহমদ ছফাকে মহাত্মা বলা উচিত কি না, সেটা বিচার করতে হলে মহিউদ্দিন আহমদের স্মৃতিকথা নয়, আহমদ ছফা রচনাবলি পড়তে হবে।’

আহমদ ছফার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎসহ পরবর্তী সময়ে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার বিষয়ে স্মৃতিচারণা করেন সলিমুল্লাহ খান। আহমদ ছফার কথাসাহিত্যের পাশাপাশি কাব্যপ্রতিভার প্রশংসা করে তিনি বলেন, আমাদের যুগে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ বড় কবি। আহমদ ছফার দুর্ভাগ্য যে তিনি তাঁদের যুগে জন্মেছিলেন। এ ছাড়া আহমদ ছফা যে চিন্তামূলক গদ্যগুলো লিখেছিলেন, সেটা আমাদের জাতির দিকনির্দেশক। আহমদ ছফার মহৎ কীর্তি তাঁর সাহিত্যের মধ্যে ধরা আছে।

‘তখন তাঁর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যেত’

আহমদ ছফার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাই। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মলে (মল চত্বর) তাঁর সঙ্গে হাঁটতাম, তাঁর বইয়ের নাম ইংরেজিতে বলতেন “দ্য ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেইড”, অর্থাৎ আমাদের জাতির যে যুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমি তাঁকে বলতাম, আপনি প্যাসিভ ভয়েসে (কর্মবাচ্য) বলছেন কেন, কে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, “দ্য ওয়ার দ্যাট ওয়াজ বিট্রেইড, বাট হু বিট্রেইড?” তখন তাঁর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যেত।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ও বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আহমদ ছফা বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন উল্লেখ করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, তখন সবাই বলত, আমাদের আওয়ামী বন্ধুরা এখনো বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াটা হচ্ছে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের খণ্ডন।...কিন্তু আহমদ ছফার বক্তব্য ছিল, যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের খণ্ডন হয়, তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তো ভারতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথা। তা তো হয়নি। আহমদ ছফার বক্তব৵টা ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এটা প্রমাণ করে না যে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব মিথ্যা হয়ে এক জাতি তত্ত্ব সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উচ্চশ্রেণি ধীরে ধীরে সব ক্ষেত্র থেকে বাংলা ভাষাকে তুলে ফেলছে বলে অভিযোগ করেন এই লেখক ও অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘যদি স্কুল–কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা না থাকে, বাংলা একটা দ্বিতীয়–তৃতীয় শ্রেণির ভাষায় পরিণত হয়; তাতে আপনার চাকরি হবে, আপনি জাতিসংঘের সভাপতি হবেন, আপনি আরও বড় বড় পদ পাবেন; কিন্তু আপনার দেশের ভেতরে শূন্যতা তৈরি হবে।’

সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘ঢাকার বড়লোকদের বাড়িঘরের নাম ও নম্বর ব্যতিক্রমহীনভাবে ইংরেজিতে, শতকরা ১০ ভাগও বাংলা দেখা যায় না। এ ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটছে। আমরা বলছি, শনৈ শনৈ উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটার নাম গ্লোবালাইজেশন। এগুলোর বিরুদ্ধে আহমদ ছফা বলতেন।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান এবং আহমদ ছফার বন্ধু ও ব্যবসায়ী নেতা আবদুল হক বক্তব্য দেন।