ছোট একটি ঘর। সেটির স্যাঁতসেঁতে দেয়াল ঘেঁষে জমে আছে পানি। সেই পানিতে জন্ম নিয়েছে এডিস মশার লার্ভা। ঘরটির অবস্থান রাজধানীর লালমাটিয়ার জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিউ কলোনি আবাসিক এলাকায়।
গতকাল শনিবার সকালে কলোনির ওই ঘরের পাশে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা দেখতে পান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশকনিধনকর্মীরা। পরে ঘরের বাসিন্দাদের স্থানটি পরিষ্কার করতে বলেন তাঁরা। এরপর সেখানে ওষুধ ছিটিয়ে লার্ভা ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া কলোনি এলাকায় আরও ছয় স্থানে পাওয়া যায় এডিসের লার্ভা। সেগুলোও ধ্বংস করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা যাচাই করে ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ডেঙ্গুর ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত করেছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিউ কলোনি আবাসিক এলাকাটি রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৯টি ওয়ার্ডকে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোতে ‘উল্টান, ফেলুন, পরিষ্কার করুন বা উফপ’ শীর্ষক বিশেষ প্রচারাভিযান চালাচ্ছে ডিএসসিসি। সংস্থাটির জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব এলাকাতেও চালানো হচ্ছে বিশেষ মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
আজ ২০ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং বর্জ্য ও সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, ফেলে দেওয়া বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, টায়ার, কৌটা কিংবা অন্যান্য বর্জ্যে পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশার ওষুধ ছিটানো নয়, সম্ভাব্য প্রজননস্থল অপসারণ করা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
ডিএনসিসির সূত্র বলছে, গত ১৫ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে রোগীদের ঠিকানা ধরে সংক্রমণ স্থানের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে ১০০টি হটস্পট নির্বাচন করা হয়েছে।
হটস্পটের বড় অংশ রয়েছে মিরপুর-পল্লবী-কাফরুল ও মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী এলাকায়। মিরপুর-২, বড়বাগ, মণিপুর, ৬০ ফিট, মিরপুর-১০, রোকেয়া সরণি, পাইকপাড়া, টোলারবাগ, আহমেদ নগর, দক্ষিণ বিশিল, দক্ষিণ পল্লবী, বাউনিয়াবাদ ও কাফরুলের কাজীপাড়া-শেওড়াপাড়া রয়েছে তালিকায়। মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক, পিসি কালচার, শ্যামলী, নবোদয় ও বাইতুল আমান হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, বছিলা, কাটাসুর, জাফরাবাদ ও রায়েরবাজারও হটস্পট।
মহাখালী-বনানী-গুলশান-করাইল থেকে বাড্ডা, রামপুরা, আফতাবনগর, সাতারকুল, ভাটারা, নূরের চালা ও দুমনি পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকাও তালিকায় রয়েছে। উত্তরা, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, দিয়াবাড়ি, তুরাগ, কামারপাড়া, রাজাবাড়ী, ধউর, দক্ষিণখান ও আশকোনার বিভিন্ন আবাসিক এলাকা এবং নির্মাণাধীন স্থাপনাও হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৬৭৮ ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি রোগী মিরপুর এলাকার—৬০৭ জন, যা মোট রোগীর ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর মোহাম্মদপুরে ৩২১ জন (১৯ দশমিক ১ শতাংশ), কচুক্ষেত, ইব্রাহিমপুর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ১৬৭ (৯ দশমিক ৯ শতাংশ), বাউনিয়ায় ১২৭ (৭ দশমিক ৬ শতাংশ), দক্ষিণখানে ৮৪ (৫ দশমিক ১ শতাংশ), মহাখালীতে ৮১ (৩ দশমিক ৮ শতাংশ), খিলক্ষেতে ৭৭ (৩ দশমিক ৬ শতাংশ), রায়েরবাজারে ৮৯ (৫ দশমিক ৪ শতাংশ), কাওলায় ৯৭ (৫ দশমিক ৮ শতাংশ) ও বসুন্ধরা এলাকায় ২৭ জন (১ দশমিক ৬ শতাংশ) ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি গত ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ে একটি জরিপ করে। এতে ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে ডিএসসিসির ২৯টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেগুলো হলো ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৫, ১৭, ২০, ২১, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৩২, ৩৬, ৩৮, ৫২, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৮, ৭০, ৭৩ ও ৭৪।
এসব ওয়ার্ডের মধ্যে ধানমন্ডি-কলাবাগান-শুক্রাবাদ, সেগুনবাগিচা-সচিবালয়, শাহবাগ-পরীবাগ-বাংলামোটর, খিলগাঁও-বাসাবো-মুগদা, লালবাগ-আজিমপুর-চকবাজার, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি, যাত্রাবাড়ী-কদমতলী-কামরাঙ্গীরচর এবং ডেমরা-সারুলিয়া-দক্ষিণগাঁও-নন্দীপাড়ার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে।
জরিপে বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়। এরপর একক বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ এবং সেমি পাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। প্রজননস্থলের মধ্যে মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, বালতিতে ১০ দশমিক ৩৪ ও প্লাস্টিকের ড্রামে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ পাওয়া যায়।
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে চিহ্নিত ১০০টি হটস্পটে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ‘একশোতে একশো’ কর্মসূচি শুরু করেছে ডিএনসিসি। গতকাল সকালে লালমাটিয়ার নিউ কলোনি এলাকায় মশকনিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কুইক রেসপন্স দলের সদস্য, রোভার স্কাউট ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা আটটি দলে ভাগ হয়ে এ কার্যক্রম চালান।
এমন একটি দলের সঙ্গে লালমাটিয়ার ‘এ’ ব্লকের নিউ কলোনি আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দলের সদস্যরা বাসাবাড়ি ও আঙিনার কোথায় কোথায় পানি জমে আছে, তা খুঁজে দেখছেন। কোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তাতে লার্ভা আছে কি না, তা–ও দেখছেন। লার্ভা পাওয়া গেলে বাসিন্দাদের দেখিয়ে করণীয় জানানো হয় এবং ওষুধ ছিটিয়ে তা ধ্বংস করা হয়। লার্ভা না থাকলে পাত্রের পানি ফেলে দেওয়া হয়।
ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গতকাল নিউ কলোনির সাতটি স্থানে লার্ভা পাওয়া যায়। আর পুরো ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করে ৪২টিতে পাওয়া গেছে এডিসের লার্ভা। মোহাম্মদপুরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ৫১টি স্থাপনা পরিদর্শন করে লার্ভা পাওয়া গেছে ৩৬টিতে।
হটস্পটের তালিকায় রয়েছে মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক। ৪ নম্বর সড়কের বাসিন্দা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা টনি চিরান জানান, গত মাসে তাঁর মেয়ে রিব্বনচি রিছিল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। মেয়ে সুস্থ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী চিমুক রিছিলও অসুস্থ হয়ে পড়েন। একাধিক পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা না পড়লেও তাঁর প্লাটিলেট ৫০ হাজারের নিচে নেমে যায়। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা। সাধারণ মানুষকে শেখানো—কোথায় কোথায় এডিস মশার বংশবিস্তার করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এসব জায়গা যাতে তৈরি না হয় এবং লার্ভা যাতে জন্মাতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা।’
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোতে ‘উফপ’ শীর্ষক বিশেষ প্রচারাভিযান চালাচ্ছে ডিএসসিসি। ‘উল্টান, ফেলুন, পরিষ্কার করুন’—এই তিনের আদ্যক্ষর নিয়ে কর্মসূচিটির নাম। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে, এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে, এমন পাত্র বা স্থাপনায় পানি জমে থাকতে দেখলে যেন উল্টে ফেলে পরিষ্কার করা হয়।
পাশাপাশি ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ‘ক্লিনিং ডে’ চালু করা হয়েছে। আগামী তিন মাস এ কার্যক্রম চলবে। এর আওতায় আবাসিক এলাকা, সড়ক, অলিগলি, ড্রেন, নালা, নির্মাণাধীন ভবন, পার্কিং, ছাদ ও পরিত্যক্ত স্থাপনায় জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিসের লার্ভা ধ্বংস, লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং ও ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হচ্ছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে ৭৫টি ওয়ার্ডেই সচেতনতামূলক র্যালি করা হচ্ছে। এতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মশকনিধনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্থানীয় নাগরিকেরা অংশ নিচ্ছেন।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, আগস্টে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বদলেছে। তাই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতি শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করছেন। আর উফপ কর্মসূচিতে স্কুলগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১৫ হাজার ৩১০ জন। এ সময়ে মারা যান ৫৪ জন। তবে আগস্টে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এক মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৮৪৬। ওই মাসে মৃত্যু হয় ৯৭ জনের। চলতি মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত ২৪ হাজার ৫৩৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ মাসে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৮১ জন। সব মিলিয়ে এ বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ৬০ হাজার ৩৭৯। আর মৃত্যু হয়েছে ১৭৮ জনের।
সংক্রমণ বাড়ার এ প্রবণতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল। জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদেরা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরুকে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ‘পিক’ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি মে মাসের যে তথ্য দিয়ে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তা খুব বেশি কার্যকর হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে রোগী ধরে ধরে হটস্পট শনাক্ত করতে হবে। উত্তর সিটিরও শুধু হটস্পট চিহ্নিত করলেই হবে না। দ্রুত সমন্বিতভাবে মশকনিধনের কাজ করতে হবে। যেখানে প্রজননস্থল থাকবে, সেখানে লার্ভা নিধনের পাশাপাশি ধোঁয়া দিয়েও মশকনিধন করতে হবে।