মেলায় পছন্দের পণ্য দেখছেন দুই নারী। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬
মেলায় পছন্দের পণ্য দেখছেন দুই নারী। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬

বাংলা একাডেমি

গ্রামীণ আবহ আর কারুপণ্যের সম্ভার নিয়ে চলছে বৈশাখী মেলা

নীলপাড় সাদা শাড়ি পরে মাটিতে বসে তাঁত বুনছেন এক নারী। তাঁর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে রঙিন ফ্রক পরা ছোট্ট একটি মেয়ে। একটু দূরে বাবরি চুলের বায়োস্কোপওয়ালা হাত নাড়িয়ে চালাচ্ছেন তাঁর জাদুর বাক্স। সেই বাক্সে উঁকি দিচ্ছে দুই শিশু। তুলা, রঙিন কাপড় আর কাঠের ফ্রেমে তৈরি পুতুলগুলো ঘিরে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।

রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে আজ মঙ্গলবার সকালে ‘বৈশাখী মেলা-১৪৩৩’-এ গিয়ে দেখা গেল এমন গ্রামীণ আবহের জীবন্ত চিত্র।

সারি সারি সাজানো পুতুল দৃষ্টি কাড়ছে ছোট-বড় সবার। বিক্রেতারা জানান, পুতুলভেদে দাম আড়াই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। একটি স্টলের সামনে টেরাকোটার তৈরি বড় আকৃতির দাবার বোর্ডও নজর কাড়ে। মুখোমুখি সাজানো দুই দলের রাজা, মন্ত্রী, গজ ও সৈন্য—পুরো সেটের দাম ধরা হয়েছে ৮ হাজার টাকা।

মেলায় একটি খেলনার দোকানে ভিড়। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬

দাবার বোর্ডটি দেখছিলেন রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুশফিকুল। তিনি বলেন, দামটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। তবে জিনিসটা খুবই আকর্ষণীয়।

সাত দিনব্যাপী এই বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও বাংলা একাডেমি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।

দেশীয় নানা পণ্য স্থান পেয়েছে এখানে। কাপড়, চামড়া, বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের মধ্যে রয়েছে পোশাক, ব্যাগ, জুতা, শতরঞ্জি ও ঘর সাজানোর সামগ্রী। আছে মাটির টেপা পুতুলও। দুপুরের দিকে মেলায় ঘুরে দেখা যায় দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে এসেছেন। তবে মেট্রোরেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ স্টেশন বন্ধ থাকায় কিছুটা ভোগান্তির কথাও জানান দর্শনার্থীরা।

মেলায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লোকজ ঐতিহ্য। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে এসেছেন মেলায়। তিনি বলেন, ‘সচিবালয় স্টেশনে নেমে হেঁটে আসতে হয়েছে। গরমে কষ্ট হয়েছে; তবে বাচ্চারা খুব খুশি।’

আয়োজকেরা জানান, মেলায় মোট ১৬০টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্যের ৭টি, জামদানির ৬টি, নকশিকাঁথার ৪টি, বস্ত্রের ৪৪টি, শতরঞ্জির ৫টি এবং মণিপুরি শাড়ির ২টি স্টল রয়েছে। পাশাপাশি কারুশিল্পী জোন, শিশুদের রাইড ও বিনোদন জোন, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ১৩টি স্টল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রান্তিক কারুশিল্পীদের জন্য ১৩টি এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ২টি স্টল বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে।

মেলায় ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দর্শনার্থী থাকলেও বেচাকেনা তুলনামূলক কম। পাটজাত পণ্য বিক্রেতা এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মানুষ আসে, দেখে, কিন্তু দাম শুনে অনেকেই চলে যায়।’

তবে পাশেই ছন দিয়ে তৈরি পণ্যের একটি স্টলে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ করা যায়। সেখানে ফলের ঝুড়ি, কাপড় রাখার ঝুড়িসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতা মেহেদি হাসান জানান, তিনি বগুড়া থেকে এসেছেন এবং তাঁর পণ্যের চাহিদা সারা দেশেই রয়েছে। পাশেই হোগলা পাতার তৈরি একটি বিছানার দাম রাখা হয়েছে ৯০০ টাকা।

পাটের ব্যাগের দোকানেও ক্রেতাদের আগ্রহ দেখা যায়। মাঝারি আকারের একটি ব্যাগ কিনতে দেখা গেল বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুল মোমেনকে। তিনি বলেন, পাটের ব্যাগ পরিবেশবান্ধব, ব্যবহারও করা যায় নিয়মিত।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬

কুটিরশিল্পের পাশাপাশি লোকজ বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে মেলায়। বর্ধমান হাউসের পাশে শিশুদের জন্য বসানো হয়েছে কাঠের নাগরদোলা ও স্লিপার, যেখানে ভিড় তুলনামূলক বেশি।

পুকুরপাড়ে বসানো হয়েছে খাবারের স্টল। সেখানে পরিবার নিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, এই গরমে আইসক্রিমই ভালো লাগছে।

মেলায় বাংলা একাডেমির প্রকাশিত বইও বিশেষ ছাড়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ে ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার পথে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর একটি দোকানে দেখা যায় দর-কষাকষির দৃশ্য। রঙিন একটি ঝুড়ির দাম দেড় শ টাকা চাইছিলেন বিক্রেতা তপন দাশ। ক্রেতা দাম বলেন ৮০ টাকা। তপন দাশ মাথা নেড়ে না করে দেন। এই প্রতিবেদকের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এত কম দাম বললে হয়? দিনাজপুর থেকে এসে বিক্রি করে পোষায় না।’