
প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মো. রাজীব। প্রায় তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে মাত্র ২০০ টাকার তেল পেলেন মোটরসাইকেলের এই চালক। শুধু রাইড শেয়ারচালক রাজীব নন, রাজধানীতে তেলের জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের গল্পই আরও কষ্টের, আরও কঠিন।
আজ শনিবার রাজধানীর রাজারবাগ, আরামবাগ, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা, মৎস্য ভবন, পরিবাগের ৭টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন। কোথাও কোথাও এই লাইন এক-দেড় কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে।
রাজধানীর রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে দুপুর ১২টার দিকে কথা হয় মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারচালক মো. রাজীবের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, প্রচণ্ড রোদের মধ্যে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। এর আগে আরও কয়েকটি পাম্প ঘুরে এসেছেন। সেগুলোতে অনেক বেশি লম্বা লাইন দেখে এই ফিলিং স্টেশনে এসে ভিড় কিছুটা কম মনে হয়েছে। তাই লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি এসে জানতে পারেন মাত্র ২০০ টাকার তেল দিচ্ছে।
মো. রাজীব বলেন, ‘কিছু করার নেই, অনেক পাম্প বন্ধ করে রাখছে। তেল থাকলেও দেয় না। এখানে তো তবু দিচ্ছে। তবে অন্য পাম্প তো ৫০০ টাকার দিচ্ছে। এখানে কাছাকাছি এসে দেখি, ২০০ টাকার দিচ্ছে। ৫০০ টাকার দিলে আমাদের জন্য ভালোই হয়। কারণ, এই তেল দিয়ে দুইটা টিপ (যাত্রী ভাড়া) মারলেই শেষ। আবার এসে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়।’
এই রাইড শেয়ারচালক আরও জানান, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ফলে তাঁদের ভাড়া কমে গেছে। স্বল্প আয়ে এমনিতেই টেনেটুনে সংসার চালাতেন। এখন ভোগান্তিতে পড়েছেন। সরকার যাতে তাঁদের কথা বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা করে, সে দাবিও জানান এই চালক।
রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার রিয়াজ হোসাইন জানান, পুলিশের সঙ্গে তাঁরা চুক্তিবদ্ধ। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের গাড়িগুলোতে তেল দিতে হয়। ফলে অন্যান্য ফিলিং স্টেশনের তুলনায় সাধারণ মানুষকে তেল কম দিতে হয় তাঁদের।
বেলা একটার দিকে আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশনে আরও দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। আরামবাগ থেকে মোটরসাইকেলের লাইন ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত এবং প্রাইভেট কারের লাইন ফকিরাপুল মোড় হয়ে রাজারবাগ পুলিশ বক্স পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। রাস্তা ঘেঁষে মোটরসাইকেলের লাইন। আর তার ডানে প্রাইভেট কারের সারি।
চৈত্রের প্রচণ্ড গরমে তেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেকে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। কেউ কেউ গরমে হাঁসফাঁস করছিলেন। সড়কের ওপর গাড়ি রেখে অনেক চালককে পাশে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে দেখা গেল।
বেলা দেড়টার দিকে মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, এই ফিলিং স্টেশনেও তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। মোটরসাইকেলের লাইন মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সামনে পর্যন্ত চলে এসেছে। আর প্রাইভেট কারের লাইন দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত চলে গেছে।
বেলা তিনটার দিকে তেলের জন্য আরও দীর্ঘ লাইন দেখা যায় রাজধানীর পরিবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে। এই ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন অনেকে। এই স্টেশনে কথা হয় মো. সজীব নামে প্রাইভেট কারের চালকের সঙ্গে। সজীব জানান, সকাল নয়টার সময় তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বেলা তিনটা বাজলেও তিনি তখনো তেল নিতে পারেননি। তাঁর সামনে আরও ৫টি গাড়ি। এরপর তেল পাবেন তিনি।
মো. সজীব প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাতিরপুল থেকে তেলের জন্য সিরিয়াল ধরে আসছি। তেল নিতে মনে হয় আরও আধা ঘণ্টা লাগবে। কত টাকার তেল দেয়, সেটি এখনো জানি না। ঈদের আগে তেল নিয়েছিলাম, আজকে আবার নিতে আসলাম।’
এই পাম্পে আড়াই ঘণ্টা ধরে তেলের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন মোটরসাইকেলচালক দীপ্ত বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘কিছু করার নেই, তেল নিব ৬০০ টাকার, শুধু ২০০ টাকার ঠান্ডা (কোমল পানীয়) খাওয়া লাগছে। কী করার আছে! আমরা সবাই পরিস্থিতির শিকার।’
রাজধানীর মৎস্য ভবন মোড়ে অবস্থিত রমনা ফিলিং স্টেশনেও তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পাম্পে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে চালকদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করতে দেখা গেছে।