
ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ছেলে ও তাঁর স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। ব্যস্ততার কারণে গ্রামের বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হয় না। তাই গতকাল যখন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় বসবাসরত বাবার সঙ্গে মুঠোফোনের ছেলের কথা হচ্ছিল, তখন তাঁকে স্ত্রী–সন্তান নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে যেতে বলেছিলেন বাবা। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য তাতে রাজি হননি ছেলে।
সেই ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর খবর আজ শুক্রবার সকালে পেয়ে ঢাকায় ছুটে এসেছেন বাবা সত্তরোর্ধ্ব খোরশেদুল আলম। রাজধানীর উত্তরায় আবাসিক ভবনে আগুন লেগে যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের তিনজন একই পরিবারের। তাঁরা হলেন খোরশেদুল আলমের ছেলে ফজলে রাব্বি, তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও তাঁদের আড়াই বছরের ছেলে মো. রিশান।
ফজলে রাব্বি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কাজ করতেন। আর আফরোজা কাজ করতেন স্কয়ার গ্রুপে। আজ শুক্রবার সকাল পৌনে আটটার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে আগুন লাগে, সেই বাড়ির পঞ্চম তলায় থাকতেন ফজলে রাব্বি তাঁর স্ত্রী সন্তান নিয়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রথমে আগুন লেগেছিল ভবনের দোতলায়। দ্রুত আগুন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তৃতীয় তলাতেও আগুন জ্বলতে থাকে। এই দুই তলার বাসিন্দারা বেঁচে গেছেন। কিন্তু আগুনের ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছয়জন প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য না জানা গেলেও পুলিশের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে।
আগুনে ছেলে, পুত্রবধূ ও একমাত্র নাতির মৃত্যুর খবর শুনে ঢাকায় এসেছেন বলে জানান খোরশেদুল আলম। বিকেলে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর বড় মসজিদে তিনজনের জানাজা হয়। এরপর তাঁদের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর পর নিজে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন খোরশেদুল আলম।
কাঁদতে কাঁদতে খোরশেদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল। আমি কিছুই করতে পারলাম না।’
খোরশেদুল আলম জানান, তাঁর একমাত্র ছেলে ফজলে রাব্বি। আর এক মেয়ে আছে, তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন।
ছেলে–নাতি দুজনই মারা যাওয়ায় খোরশেদুলের পরিবারে ‘আলো জ্বালানোর’ মতো আর কেউ রইল না। স্বজন হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়া প্রবীণ এই ব্যক্তি বলেন, গতকাল যখন ফজলে রাব্বির সঙ্গে কথা হয়, তখন বলেছিলেন এক সপ্তাহ কুমিল্লায় গিয়ে থেকে আসার জন্য। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা থাকায় ছেলে যেতে রাজি হননি।
‘কুমিল্লায় গেলে হয়তো পরিবারসহ সন্তানের মৃত্যুর সংবাদটা শুনতে হতো না,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন তিনি।
এ সময় সেখানে উপস্থিত জিয়াদ নামে ফজলে রাব্বির এক আত্মীয় জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ফজলে রাব্বির মা শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে পরিবারের অন্যদেরও একই অবস্থা।
ফজলে রাব্বির স্ত্রী আফরোজার পরিবারও উত্তরা এলাকায় থাকে। এ ঘটনার পর আফরোজার বাবা ও মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁরা ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না বলে আফরোজার বোন আফরিন জাহান জানিয়েছেন।
খোরশেদুল আলম জানান, নিহত ফজলে রাব্বি, তাঁর সন্তান ও স্ত্রীকে তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চিওড়ায় আগামীকাল দাফন করা হবে।
এই আগুনের ঘটনায় ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা অপর একটি পরিবারের আরও তিনজন মারা গেছেন। তাঁরা হলেন মো. হারিস (৫২), তাঁর ছেলে মো. রাহাব (১৭) ও ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৭)।