
শুধু ইটের গাঁথুনির দেয়ালটি সংস্কারে চার বছর আগে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সময়মতো কাজ হলে প্রাণহানি এড়ানো যেত।
রাজধানীর মিরপুর কলেজের যে দেয়াল ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, সেটি নির্মাণেই ছিল গুরুতর ত্রুটি। আগে ওই সীমানাপ্রাচীরে ইটের গাঁথুনি ছিল তিন-চার ফুটের, ওপরের বাকি অংশে ছিল লোহার গ্রিল। ২০১৪ সালে গ্রিল অপসারণ করে পুরোনো দেয়ালের ওপর আরও ইটের গাঁথুনি দিয়ে সেটি উঁচু করা হয়। ওই সময় রড-কংক্রিটের কোনো কলাম নির্মাণ করা হয়নি। ফলে প্রায় এক দশক ধরে দুর্বল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল পুরো দেয়াল।
ঝুঁকিপূর্ণ ওই দেয়াল সংস্কার এবং নতুন ফটক নির্মাণের জন্য ২০২২ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করেছিল। কিন্তু চার বছরেও সেই কাজ শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ ও অনুমোদিত সংস্কারকাজ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণেই দেয়াল ধসে পড়ে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে।
মিরপুর কলেজের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, শুরুতে কলেজের চারপাশে তিন–চার ফুট উঁচু ইটের দেয়াল ছিল, এর ওপর ছিল লোহার অ্যাঙ্গেলের তৈরি গ্রিল। ২০১৪ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের সময় গ্রিল অপসারণ করে পুরোনো দেয়ালের ওপর ইটের গাঁথুনি দিয়ে সেটির উচ্চতা বাড়ানো হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের মতে, পিলার ছাড়া দেয়াল নির্মাণ গুরুতর কারিগরি ত্রুটি।
গত মঙ্গলবার দুপুরে কলেজটির পেছনে খাদ্য অধিদপ্তরের খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচির ট্রাক থেকে কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে সারিতে অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর হঠাৎ সীমানাপ্রাচীরের একটা অংশ ধসে পড়ে। এতে গুরুতর আহত নাসিমা বেগম ও মো. ফিরোজকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার রাতেই মারা যান বিউটি বেগম। এ ঘটনায় আহত ৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করার আগেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তাঁরা দ্রুত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছেন।ইফ্ফাত আজমী, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, মিরপুর কলেজ
দেয়ালধসের ঘটনায় গতকাল রাত পর্যন্ত মামলা হয়নি বলে জানান মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন পঙ্গু হাসপাতালে আর তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। সবাই শঙ্কামুক্ত বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
মিরপুর কলেজের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, শুরুতে কলেজের চারপাশে তিন–চার ফুট উঁচু ইটের দেয়াল ছিল, এর ওপর ছিল লোহার অ্যাঙ্গেলের তৈরি গ্রিল। ২০১৪ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের সময় গ্রিল অপসারণ করে পুরোনো দেয়ালের ওপর ইটের গাঁথুনি দিয়ে সেটির উচ্চতা বাড়ানো হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের মতে, পিলার ছাড়া দেয়াল নির্মাণ গুরুতর কারিগরি ত্রুটি।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইফ্ফাত আজমী প্রথম আলোকে বলেন, যে সময়ে প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন দায়িত্বে থাকা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। ২০২১ সালের আগস্টে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তৎকালীন অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। এক ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, নম্বরটি গোলাম ওয়াদুদের নয়।
দুর্ঘটনার পর অবশিষ্ট সীমানাপ্রাচীরও ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাই বিদ্যমান দেয়ালের কোনো অংশ মেরামত বা সংস্কার না করে পুরোটাই ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হবে।
গতকাল বেলা একটায় সরেজমিন দেখা যায়, মঙ্গলবারের ঘটনায় দেয়ালের যে অংশ ধসে পড়েছিল, তার পাশের অন্য অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ওই অংশে অস্থায়ী টিনের বেড়া দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রমতে, সময়মতো সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করা হলে দেয়ালধসের এ ঘটনা এড়ানো যেত।
কলেজের বর্তমান প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে সীমানাপ্রাচীর সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই কাজ শুরু না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ দেয়ালটি এখনো রয়েছে। সূত্রমতে, সময়মতো সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করা হলে দেয়ালধসের এ ঘটনা এড়ানো যেত।
সূত্র বলছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে কলেজের মূল ফটক, সীমানাপ্রাচীর ও অন্যান্য অবকাঠামো সংস্কারের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এইচ এম মাহবুবুর রহমান। এর আগে একই বিষয়ে স্থানীয় ঢাকা-১৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আগা খান মিন্টুও প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি ডিও (আধা সরকারি) চিঠি দিয়েছিলেন। এরপর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০২২ সালের বরাদ্দ তালিকায় মিরপুর কলেজের জন্য ২০ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। বরাদ্দের কাজের বিবরণে উল্লেখ ছিল, ‘সীমানাপ্রাচীর, গেট নির্মাণসহ অভ্যন্তরীণ রাস্তা মেরামত ও সংস্কার’।
কেন এত দিনেও কাজ শুরু করা হয়নি, তা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বলতে পারবে উল্লেখ করে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইফ্ফাত আজমী বলেন, দুর্ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করার আগেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তাঁরা দ্রুত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফ ভিন্ন দাবি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০২২ সালের ২০ লাখ টাকার বরাদ্দ মূলত কলেজের প্রধান ফটক নির্মাণের জন্য ছিল। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও একই কাজে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই দফার বরাদ্দ একত্র করে প্রধান ফটক নির্মাণের ব্যয়-প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলছিল। এ অবস্থায় দেয়ালধসের ঘটনা ঘটে। মনজুরুল আলম জানান, দুর্ঘটনার পর সীমানাপ্রাচীর নতুন করে নির্মাণের জন্য আলাদা বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দেয়ালধসে হতাহতের ঘটনায় গতকাল প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে টিসিবির ট্রাক সেল (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানিয়েছে টিসিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, টিসিবির কোনো ট্রাক সেল কার্যক্রম এখন চলমান নেই।
তবে প্রথম আলো টিসিবির ট্রাক সেলের তথ্য পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী উল্লেখ করেছিল। পরে যাচাই করে দেখা যায়, ওই ট্রাক সেল ছিল খাদ্য অধিদপ্তরের ওএমএসের। বিষয়টি মিরপুরের ওই এলাকায় খাদ্য অধিদপ্তরের এলাকা রেশনিং কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত এ ভুলের জন্য প্রথম আলো দুঃখ প্রকাশ করছে।