বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা আহসান মঞ্জিলে ঈদের ছুটিতে এসেছেন অসংখ্য মানুষ। ২৩ মার্চ, ঢাকা
বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা আহসান মঞ্জিলে ঈদের ছুটিতে এসেছেন অসংখ্য মানুষ। ২৩ মার্চ, ঢাকা

ঈদের ছুটিতে আহসান মঞ্জিলে ভিড়, ঘুরতে এসে শেখার ইচ্ছা অনেকের

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে রাজধানীর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা আহসান মঞ্জিলেও মানুষের ঢল নেমেছে।

আজ সোমবার বেলা ১টায় পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলের প্রবেশদ্বারে দেখা যায়, লম্বা লাইনে টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছেন দর্শনার্থীরা।

প্রাসাদসদৃশ এই স্থাপনার গোলাপি দেয়াল আর নবাবি আমলের নিদর্শনগুলো দেখতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে এসেছেন অনেকে।

কেউ এসেছেন রাজধানী থেকে, আবার কেউ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে—শুধু ইতিহাসকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখার টানে।

প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য নুর ইসলাম জানান, সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় আছে। দুপুরের পর মানুষের জনসমাগম আরও বাড়তে দেখা যায়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন। সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার।

প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক সিঁড়ি, প্রশস্ত মাঠ ও গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন তরুণ-তরুণীরা। কেউ আবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্মৃতিবন্দী করছেন মুহূর্তগুলো। কেউ প্রশস্ত মাঠে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন।

যদিও নিদর্শনে হাত দেওয়া বা ছবি তোলার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে, তবু অনেকে সেই নিয়ম অমান্য করে ছুঁয়ে দেখছেন শত বছরের পুরোনো স্মৃতি, তুলছেন ছবি।

রাজধানীর মিরপুর থেকে আসা রাশেদ মাহমুদ, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঘুরছেন এক গ্যালারি থেকে আরেক গ্যালারিতে। পুরোনো আসবাবের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে একটু ভিন্ন কিছু দেখাতে চেয়েছিলাম। বইয়ে পড়া ইতিহাসটা ওরা এখানে এসে বাস্তবে দেখছে—এটাই বড় পাওয়া।’

তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তার স্ত্রী নাজিয়া রহমান যোগ করেন, ‘জায়গাটা শুধু ঘোরার নয়, শেখারও। এত সুন্দর করে সংরক্ষণ করা হয়েছে—তবে ভিড় একটু বেশি হওয়ায় ঠিকমতো সব দেখা যায় না।’

এদিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী সুমাইয়া আক্তার দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি পুরোনো দরজার সামনে। হাতে মোবাইল, মাঝেমধ্যে ছবি তুলছেন। তিনি বলেন, ‘ছোটকাল থেকে শুনে আসছি, আহসান মঞ্জিলের কথা। আজ এসে মনে হচ্ছে, যেন ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে পড়েছি।’

ভবনের ভেতরে বিভিন্ন নিদর্শন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছিল ছোট্ট মেয়ে তানহা, বয়স মাত্র ৮। তার চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক। দেয়ালে টাঙানো ছবির দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘এগুলো কি সত্যি আগের সময়ের? রাজা-বাদশাহরা থাকত এখানে?’

পাশে থাকা তার ছোট ভাই আরিয়ানও উৎসাহ নিয়ে যোগ করে, ‘আমি এত বড় বাড়ি আর দেখিনি।’

ভিড়ের চাপে অনেক সময়ই স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীরা বারবার সতর্ক করলেও কিছু দর্শনার্থী নিদর্শনে হাত দিচ্ছেন, ছবি তুলছেন নিষিদ্ধ জায়গায় দাঁড়িয়ে।

ইতিহাসকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখার টানে আহসান মঞ্জিলে দর্শনার্থীদের ভিড়। ২৩ মার্চ, ঢাকা

এতে ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।

তারপরও, সব কোলাহলের মধ্যেও আহসান মঞ্জিল যেন তার নিজস্ব মহিমা ধরে রেখেছে।

নবাবি আমলের ইতিহাস, স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর মানুষের আগ্রহ—সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য মিলনমেলা।

মুন্সিগঞ্জ থেকে আরিফ হোসেন তাঁর পরিবারের ৯ সদস্যকে নিয়ে এসেছেন বেড়াতে। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি। দূরে কোথাও সবাইকে নিয়ে যেতে হলে অনেক সময় ও খরচের প্রয়োজন। কিন্তু এখানে ছোটরা ইতিহাস জানবে।’

তবে আগের নিদর্শন অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে বলে আরিফ হোসেন মনে করছেন। তাঁর অভিযোগ, ১৫ বছর আগেও তিনি একবার আহসান মঞ্জিলে এসেছিলেন। তখন খাবারের প্লেটগুলো ছিল পিতলের। এখন দেখে মনে হচ্ছে, প্লেটগুলো মেলামাইন বা কাচের।

আরিফ হোসেন বলেন, ‘সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আহসান মঞ্জিলকে আরও পরিপাটি করা যেতো। ভালো রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে মানুষের আগ্রহ আরও বেশি থাকত।’

আরিফ হোসেনের সঙ্গে ছিল তাঁর মেয়ে আনাবিয়া। সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আনাবিয়া বলে, ‘আমি সব পুরোনো দিনের সব জিনিস দেখেছি। নবাবদের ব্যবহার করার অনেক আসবাব, খাট, তলোয়ার অনেক কিছু। দেখে ভালো লেগেছে। মনে হচ্ছে, আমি সেই সময় থেকে ঘুরে এলাম।’