পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে জবির প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা

রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় একটি মেস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সাদাপোশাকের ওই ব্যক্তিদের কাছে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা পরিচয়পত্র না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের বাধায় তাঁরা ফিরে যেতে বাধ্য হন। পরে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন , ওই ব্যক্তিরা র‌্যাব-২-এর সদস্য ছিলেন। আজ রোববার সকালে এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী ওই প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীর নাম মমতাজ আরা বর্ষা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন বলে তাঁর দুজন সহপাঠী জানিয়েছেন।

সকালের ঘটনা নিয়ে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতাজ আরা বর্ষা। সেখানে তিনি দাবি করেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র‌্যাবের ওপর প্রভাব খাটিয়ে প্রতিশোধ নিতে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ আরা বর্ষা বলেন, ‘এ বছরের মে মাসে আমার ছোট বোনের হাজবেন্ডের (সুমন মিয়া) সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকেই সুমন আমাদের পরিবার ও আমার বোনকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছিল।’

মেস থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মমতাজ আরা আরও বলেন, ‘আমরা গত মাসে (আগস্ট) দিনাজপুর জজকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এরপর ফোনে ও মেসেজের মাধ্যমে হুমকি দেয়। সুমন মিয়া র‌্যাবের আইটি সেকশনে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। সে র‌্যাবের সেই পরিচয় ব্যবহার করে আমাকে অপহরণের চেষ্টা করেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা করায় সে প্রতিশোধ নিয়েছে।’

সকালের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী বলেন, ‘খুব ভোরে সিভিল ড্রেসে কয়েকজন এসে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করে। অপরিচিত হওয়ায় আমরা দরজা খুলিনি। তারা র‌্যাবের পরিচয় দেয়, কিন্তু কোনো আইডি কার্ড, মামলা কিংবা ওয়ারেন্ট তারা দেখাতে পারেনি। তারা বিশ্রী ভাষায় আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আমরা বারবার ওয়ারেন্ট দেখাতে বললেও তারা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আমাকে তুলে নিতে চায়। আমার বাসাও সার্চ করে। কিন্তু সেখানে কোনো নারী র‌্যাব সদস্য ছিল না।’

র‌্যাবের পুরুষ সদস্যরা কীভাবে নারীদের মেস সার্চ করে– সে প্রশ্ন তুলে এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘ওয়ারেন্ট ছাড়া কীভাবে আমাকে তুলে নিতে চায়? এ ঘটনায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমি আমার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থীকে তুলে নিতে আসা র‌্যাবের স্টিকারযুক্ত সেই গাড়ি

মেসের নারী শিক্ষার্থীদের কাছে খবর পেয়ে সকালেই ঘটনাস্থলে ছুটে যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক জানান, প্রথমে ওই ব্যক্তিরা ভুল করে সেখানে এসেছেন বললেও পরে জানান, তাঁরা চুরির মামলার আসামি ধরতে এসেছেন। এর মধ্যেই ছাত্রীকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।

তারেক বিন আতিক বলেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে দেখি শিক্ষার্থীকে গাড়িতে ওঠানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বলি, শিক্ষার্থী এখান থেকে যাবে না। শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ থাকলে প্রক্টর অফিস ও উপাচার্যকে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি জানান, ওই ব্যক্তিরা পরিচয়পত্র ও মুঠোফোন নম্বর দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার পর আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, একজন শিক্ষার্থীকে র‌্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জানিয়ে এই সহকারী প্রক্টর বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি আইন অনুযায়ী তদন্ত হবে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনার পেছনে কোনো অনিয়ম বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘটনার বিষয়ে জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং সূত্রাপুর থানার ওসিকে বিষয়টি জানান। পরে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ঘটনাস্থলে আসেন। র‌্যাবের পরিচয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথমে সন্দেহ তৈরি হলেও পরে সেখানে পোশাকধারী র‌্যাব সদস্যরা আসেন। শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় সূত্রাপুর থানা-পুলিশ। সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা মোহাম্মদপুর র‌্যাব-২-এর সদস্য।

ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, ‘সেখানে যারা এসেছিল, তারা র‌্যাবের সদস্য ছিল এবং একটি মামলার অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিল। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, এটি পারিবারিক বিরোধের কারণে করা একটি মামলা। পরে ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়ে তারা চলে যায়।’

মামলাটির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগ করে ভালোভাবে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।