জাপানে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চলে
জাপানে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চলে

প্রথম আলো এক্সপ্লেইনার

মেট্রোরেল না মনোরেল, ঢাকায় কোনটি সুবিধাজনক

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাকার গণপরিবহন-ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছিল মেট্রোরেল। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এর পাশাপাশি মনোরেল চালুর কথা বলেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মোহাম্মদপুর, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মনোরেলকে মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

২০ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বনানী সোসাইটি আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও মতবিনিময় সভায় মনোরেলের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এর আগে গত জুনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর চট্টগ্রামেও মনোরেল চালুর উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সাড়ে ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি রুটে মনোরেল নির্মাণ করতে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন ও আরব কন্ট্রাক্টরস—এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়।

চট্টগ্রামে মনোরেলের সম্ভাব্য রুটগুলো হচ্ছে—কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার, সিটি গেট থেকে শহীদ বশিরুজ্জামান চত্বর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং অক্সিজেন থেকে ফিরিঙ্গিবাজার পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

ঢাকার পাশের নগর নারায়ণগঞ্জেও মনোরেল নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০০৫ সালে ঢাকার ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করে সরকার। পরে জাপানের অর্থায়নে এবং জাপানের পরামর্শকেরা ২০১৪ সালে এসটিপি সংশোধন করে আরএসটিপি তৈরি করে। এর আলোকেই ঢাকার গণপরিবহন উন্নয়নে নানা প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

মনোরেলের অবকাঠামো নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয়। সরু পথ ও ঘন শহর এলাকায় সহজেই নির্মাণ করা যায়, মনোরেল আঁকাবাঁকা পথে চলতে পারে। মেট্রোরেলের চেয়ে মনোরেলের নির্মাণে ব্যয় তুলনামূলক কম।

এসটিপি প্রণয়নের সময়ই কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ ঢাকায় মনোরেল চালুর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এসটিপিতে উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল (উড়াল ও পাতাল পথে) ও বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতেই সরকার ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন চালু হয়েছে।

ঢাকার মেট্রোরেল দিনে চার লাখের মতো যাত্রী পরিবহন করছে

মনোরেল কী

মনোরেলের হচ্ছে একটি মাত্র লাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী পরিবহন। একটি মাত্র বিমের ওপর ট্রেন চলাচল করে। এর জন্য আলাদা দুটি লাইন দরকার হয় না। প্রচলিত রেল বা মেট্রোরেলে দুটি লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল করে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলমান মেট্রোরেলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় বড় খুঁটির ওপরে তার টানতে হয়েছে। মনোরেলে লাইনের সঙ্গেই বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা যুক্ত থাকে। ফলে খুঁটি বা তারের জন্য বাড়তি ভার বহনের উপযোগী কাঠামো দরকার হয় না।

মনোরেল চলাচল এবং এর অবকাঠামো নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয়। সরু পথ ও ঘন শহর এলাকায় সহজেই নির্মাণ করা যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে মেট্রোরেলের চেয়ে মনোরেলের নির্মাণে ব্যয় তুলনামূলক কম। এ ছাড়া মনোরেল আঁকাবাঁকা পথে চলতে পারে। মেট্রোরেলের লাইন বাঁকা হলে গতি কমাতে হয় এবং নির্মাণ কৌশলে বাড়তি খরচ করতে হয়।

মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে মনোরেল নিয়ে ভাবতে হবে। এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত সরু, ঘনবসতি এলাকাকে যুক্ত করতে হবে।
অধ্যাপক সামছুল হক, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

বিশ্বের বড় বড় শহরে মেট্রোরেল জনপ্রিয় বাহন। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মেট্রোরেল পাতাল পথে বেশি। জাপান, চীন, ভারতসহ অনেক দেশে উড়ালপথে মেট্রোরেল চলে।

চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশেই মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চলাচল করছে। মিসরের কায়রো ও চীনের গুইলিনে নির্মাণকাজ চলমান আছে। তবে মনোরেলে যাত্রী পরিবহনক্ষমতা মেট্রোরেলের চেয়ে কম হয়।

মেট্রোরেলের পরিপূরক

মেট্রোরেল ও মনোরেল দুটিই গণপরিবহন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুটির মধ্যে ঢাকায় মনোরেলের কী সুবিধা? ঢাকার জনঘনত্ব বেশি, শহরও গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে চাইলেই সব পথে মেট্রোরেল নির্মাণ করা যাবে না। যেমন সরু পথের কারণে পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় বাসই চলতে পারে না। একই অবস্থা খিলগাঁও, গোড়ান, বাসাবোসহ কিছু কিছু এলাকায় গণপরিবহনের ব্যবস্থা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব জায়গায় সড়ক সরু, বড় বড় ভবন উঠে গেছে। ফলে মেট্রোরেল নির্মাণ করতে হলে পাতাল পথে করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণও। এসব এলাকায় সহজেই মনোরেল করা যায়। এমনকি আঁকাবাঁকা পথ হলেও সমস্যা নেই।

মনোরেল হয়তো কোনো কোনো শহর বা এলাকার জন্য উপযুক্ত না-ও হতে পারে। যেমন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শহরের মনোরেল প্রকল্প বাতিল করতে হয়েছে। কারণ, বড় শহরে যে পরিমাণ যাত্রীর চাপ, তা মনোরেল দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে। আবার বিশ্বে বর্তমানে বহু মনোরেল সফলভাবে চলছে। ফলে অনেক দেশেই মেট্রোরেল, মনোরেল, উড়ালসড়ক, বিআরটিএসহ বহুমাত্রিক গণপরিবহন-ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। যেমন ভারতের মুম্বাই শহরে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেলও রয়েছে।

ভারতের মুম্বাইয়ের মনোরেল দিনে দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করে

গণপরিবহন-বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মেট্রোরেলের জন্য ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর ও সহজ পথ হচ্ছে মতিঝিল-উত্তরা পথটি। এই পথে যাত্রী বেশি। এরপরও বাড়তি ব্যয়ের কারণে ভাড়া আশপাশের দেশের তুলনায় বেশি ধার্য করতে হয়েছে। পরের মেট্রোরেল লাইনগুলোর বড় অংশ পাতাল পথে হচ্ছে। ব্যয় আরও বাড়বে। তখন ভাড়া কী আরও বাড়ানো হবে? এতে তো তা আর গণপরিবহন থাকবে না।

অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে মনোরেল নিয়ে ভাবতে হবে। এর মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত সরু, ঘনবসতি এলাকাকে যুক্ত করতে হবে। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান মেট্রোরেলটি বিজয় সরণি থেকে খামারবাড়িতে এসে বড় মোড় নেয়। এ জন্য সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করতে হয়েছে। মনোরেল হলে বাঁকা করেই মূল সড়ক দিয়ে চালানো যেত। খরচও কম হতো।

ঢাকার মেট্রোরেলে প্রতি কিলোমিটার লাইন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। ভারতের মুম্বাইয়ে মনোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছে ১৬৪ কোটি টাকা। মুম্বাইয়ের মনোরেল দৈনিক দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারে। বিপরীতে ঢাকার মেট্রোরেল দিনে গড়ে ৪ লাখের মতো যাত্রী পরিবহন করে।

মেট্রো ও মনোরেল—ব্যয় বড় প্রশ্ন

ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলটি উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এখন চললেও তা কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এই লাইনটির প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এই লাইনের পুরোটাই উড়ালপথে নির্মিত।

বর্তমানে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এবং নর্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত আরেকটি মেট্রোরেল লাইনের প্রকল্প চলমান, যা এমআরটি লাইন-১। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)-এর পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি মেট্রোরেল লাইনেরই কিছু অংশ উড়াল এবং কিছু অংশ পাতালপথে হবে। ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান। তবে ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ার তথ্য থেকে জানা গেছে, এই দুটি মেট্রোরেল লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

ভারতের মুম্বাই শহরে ২০ কিলোমিটার মনোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশি টাকায় ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১৬৪ কোটি টাকা। অবশ্য ভারতে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় হয় ৪০০-৫০০ কোটি টাকার মধ্যে। মুম্বাই মনোরেলের একাংশ চালু হয় ২০১৪ সালে, আরেকটি অংশ চালু হয় ২০১৯ সালে।

মুম্বাইয়ের মনোরেল দৈনিক দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারে। বিপরীতে ঢাকার মেট্রোরেল দিনে গড়ে ৪ লাখের মতো যাত্রী পরিবহন করে। এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চলছে মনোরেল

মিসরের ৯৬ কিলোমিটার মনোরেল প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে সাড়ে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ৬০০ কোটি টাকার সমান। এই মনোরেলের কাজ পেয়েছে কানাডাভিত্তিক বোম্বারডিয়ার ও মিসরের ওরাসকম কনস্ট্রাকশন। অবশ্য নির্মাণ ব্যয়ের আওতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩০ বছর পর্যন্ত মনোরেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণও করবে।

বাংলাদেশে মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। আশপাশের দেশ থেকে অনেক ব্যয় বেশি বাংলাদেশে। ফলে গণপরিবহন অবকাঠামোর বিকল্প নানা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা আছে।