
গত শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা। কাজীপাড়ায় প্রধান সড়কে জমেছিল হাঁটুপানি। তলিয়ে গিয়েছিল দুই পাশের ফুটপাতও। এর প্রায় ৩৩ ঘণ্টা পর গতকাল সোমবার বিকেল চারটার দিকেও ওই এলাকার সড়কে জলাবদ্ধতা ছিল।
কাজীপাড়া মেট্রোস্টেশনের পাশের ফুটপাতে অস্থায়ীভাবে রুটি, কলা, চা ও বিস্কুট বিক্রি করেন সোহেল হোসেন। জলাবদ্ধতার কারণে রোববার তিনি দোকান খুলতে পারেননি। গতকাল বিকেল চারটার দিকে তিনি জানান, সড়কে জমে থাকা পানি সরেনি।
গতকাল বেলা একটার দিকে দেখা যায়, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে কাজীপাড়ামুখী বেগম রোকেয়া সরণির আল হেলাল হাসপাতাল থেকে হাতিল ফার্নিচারের শোরুম পর্যন্ত প্রায় ২৫০ মিটার সড়কের বেশির ভাগই পানিতে তলিয়ে আছে। সড়ক বিভাজকের দুই পাশের কিছু অংশে পানি না থাকলেও অধিকাংশ জায়গায় বিভাজক পর্যন্ত পানি জমে ছিল। পানি এড়িয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছিলেন পথচারীরা। অনেকে জুতা হাতে নিয়ে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। ধীরগতিতে এক লেন ধরে যানবাহন চলাচল করায় সেখানে সাময়িক যানজটও সৃষ্টি হয়।
জলাবদ্ধতার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান বলেন, আগে কাজীপাড়ার বৃষ্টির পানি দুটি পথে নিষ্কাশিত হতো। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের জলাবদ্ধতা কমাতে ওই এলাকার আউটলেট কাজীপাড়ার নিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে গোলচত্বরের পানি দ্রুত নামলেও কাজীপাড়ার পানি সরতে এখন বেশি সময় লাগছে।
গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে রাজধানীর দুই সিটির বিভিন্ন এলাকার সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। মিরপুর-১ নম্বরের প্রিয়াঙ্কা চাইনিজ এলাকার সামনের সড়ক, কালশী সড়ক, সোবহানবাগ, তল্লাবাগ, শুক্রাবাদ, পশ্চিম রাজাবাজার, খিলক্ষেতের টানপাড়া ও জামতলা এলাকায় জলাবদ্ধতা ছিল।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন নিউমার্কেট এলাকায় ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের সামনের সড়ক, লালবাগের অরফানেজ রোড, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কার্যালয়ের সামনের এলাকা, ঢাকা মেডিকেল কলেজসংলগ্ন জহির রায়হান সড়ক, চানখাঁরপুল, শহীদুল্লাহ হলের সামনের সড়ক, বকশীবাজার মোড়, মতিঝিল, আরামবাগ, নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, শান্তিনগর ও কাঁঠালবাগান এলাকায়ও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
গতকাল বেলা দুইটার দিকে তল্লাবাগ এলাকা থেকে শুক্রাবাদ জামে মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা যায়। সড়কের বিভিন্ন অংশে হাঁটুসমান পানি জমে ছিল। সেই পানি মাড়িয়েই স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল করতে দেখা যায়। অনেকে বাধ্য হয়ে রিকশায় করে জলাবদ্ধ অংশ পার হচ্ছিলেন।
তল্লাবাগের বাসিন্দা সুমন ইসলাম বলেন, বৃষ্টি হলেই এ সড়কে পানি জমে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা এই ভোগান্তির মধ্যে আছেন। তাঁর ভাষায়, ‘কোনো পরিবর্তন নেই। এক দশক ধরে একই দুর্ভোগে আছি। এ সময়ের মধ্যে অন্তত দুবার সড়ক উঁচু করা হয়েছে। আগে সড়কে আরও বেশি পানি জমত। এখন সড়কে তো পানি জমেই, উল্টো আশপাশের বাসাবাড়ির নিচতলায়ও পানি ঢুকে যায়।’
আগে কাজীপাড়ার বৃষ্টির পানি দুটি পথে নিষ্কাশিত হতো। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের জলাবদ্ধতা কমাতে ওই এলাকার আউটলেট কাজীপাড়ার নিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে গোলচত্বরের পানি দ্রুত নামলেও কাজীপাড়ার পানি সরতে এখন বেশি সময় লাগছে।ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান
গতকাল বিকেল আড়াইটার দিকে নিউমার্কেট এলাকার নূরজাহান সুপার মার্কেট ও ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের সামনের সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা যায়। হাঁটুপানি ঠেলে চলাচল করছেন পথচারীরা। যানবাহন চলাচলের সময় সৃষ্ট ঢেউয়ে সেই পানি মার্কেটের ভেতরেও ঢুকে পড়ছিল। এতে নিচতলার অনেক দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কয়েকজন দোকানিকে লাঠি দিয়ে ম্যানহোলের মুখ পরিষ্কার করে পানি নামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। তবে একই সময় সড়কের উল্টো পাশে ঢাকা নিউমার্কেটের সামনের অংশ ছিল পানিমুক্ত।
ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, এক ঘণ্টার বৃষ্টি হলেই নূরজাহান শপিং সেন্টারের সামনের সড়কে পানি জমে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘রোববার সকালে আইসা দেখি দোকান পানিতে ডুইবা গেসে। ময়লা পানিতে ভিজে মালামাল নষ্ট হইছে। আজকাও দেখি সড়কে পানি, নামতাসে না। দুই দিন ধইরা বেচাকেনা বন্ধ।’
বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে লালবাগের অরফানেজ রোড, বকশীবাজারে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কার্যালয়ের সামনের সড়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সামনের এলাকায় গিয়েও হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোববারের ভারী বৃষ্টির পানি পুরোপুরি নামার আগেই সোমবার সকালে আবার বৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতা বেড়ে যায়।
বকশীবাজারে শিক্ষা বোর্ড কার্যালয়ের সামনের সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের যেসব অংশ তুলনামূলক উঁচু ছিল, চালকেরা সেদিক দিয়েই যানবাহন চালানোর চেষ্টা করছিলেন। বিকেলে পানির মধ্যে চলতে গিয়ে একটি ভ্যান উল্টে যায়। একই সময়ে পানি ঢুকে একটি লেগুনা বিকল হয়ে পড়লে যাত্রীরা মাঝপথেই দুর্ভোগে পড়েন।
ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকার পানি তিনটি পাম্পস্টেশন হয়ে নিষ্কাশিত হয়, যা দিয়ে সর্বোচ্চ ২৫-৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্কাশন করা সম্ভব। কিন্তু সক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে পানি সরতে সময় লাগছে। ফলে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি নিষ্কাশন করতে হলে দক্ষিণ সিটিতে আরও বেশি পাম্পস্টেশন স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গতকাল সকালেও কর্মদিবসের শুরুর ব্যস্ত সময়ে রাস্তায় জমে থাকা পানি, বৃষ্টিতে গণপরিবহনের সংকট এবং রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নগরবাসী। সকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছাতা হাতে বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অনেক যাত্রীকে। বাস না আসায় অনেকেই বিকল্প উপায়ে হাঁটুপানি মাড়িয়ে গন্তব্যের পথে রওনা দেন। আবার কেউ অতিরিক্ত ভাড়ায় রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রা করেন।
ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা বৃষ্টির পানির সার্বিক পরিস্থিতি গতকাল বিকেলে পরিদর্শন করেছেন ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। এ সময় জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ নিরসনের বিষয়ে প্রশাসক বলেন, বেদখল হয়ে যাওয়া খালগুলো দখলমুক্ত করে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করতে হবে। খালগুলো পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত নগরের জলাবদ্ধতা কখনোই কমবে না।