
সত্য প্রকাশে কোন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম, তা মোকাবিলার উপায় কী, তা খুঁজতে শতাধিক দেশের হাজারো সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এখন বন শহরে আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনে। জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে আয়োজিত ‘ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’ শীর্ষক এই সম্মেলনে বিশ্বের নেতৃত্বস্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিচ্ছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। দুই দিনের এই সম্মেলনে তিনি বেশ কয়েকটি আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় যোগ দেন।
এদিকে এই আয়োজন থেকে এবার ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে হংকংয়ের প্রকাশক জিমি লাইকে। কারাবন্দী এই সংবাদ প্রকাশকের পক্ষে পুরস্কার নেন তাঁর মেয়ে ক্লেয়ার লাই।
মুক্ত সাংবাদিকতাকে শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করার লক্ষ্যে প্রতিবছর বন শহরে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম আয়োজন করে ডয়চে ভেলে। ‘নির্ভীক, সোচ্চার সাংবাদিকতা’ স্লোগানে এবারের সম্মেলন শুরু হয় গতকাল মঙ্গলবার।
বন শহরে পুরোনো পার্লামেন্ট ভবনে আয়োজিত ভিড়ে ঠাসা সম্মেলনস্থলে বিভিন্ন অধিবেশন যেমন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তেমনি পাশের ডয়চে ভেলের মূল ভবনেও চলছে নানা আলোচনা ও মতবিনিময় সভা।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সম্মেলনস্থল এবং এর বাইরে বেশ কয়েকটি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
সম্মেলনের প্রথম দিন মঙ্গলবার প্রথম আলো সম্পাদক মতবিনিময় করেন ডয়েচে ভেলে মার্কেটিং ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ম্যাক্সমিলিয়ান পায়কার্ট, ডানিয়েল ভোগেলগেসাং এবং ডয়চে ভেলে এশীয় বিভাগের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর দেবারতি গুহ, তার সহকারী মিকো স্ট্যুবনের-লানকুটিস এবং ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের প্রধান সঞ্জীব বর্মনের সঙ্গে।
প্রথম মতবিনিময় সভায় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান দৈনিক খবর প্রকাশের বাইরে দেশজুড়ে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষসহ ছাত্র, পেশাজীবী, নারীবিষয়ক নানা ধরনের আয়োজন এবং প্রথম আলোর ক্রমবর্ধমান পাঠকপ্রিয়তার কথা তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিন আজ বুধবার সকালে প্রথম আলো সম্পাদক ডয়চে ভেলের সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের পরিচালক পেট্রা শ্নাইডারের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে মতিউর রহমান নারী, শিশু, শরণার্থীসহ সমাজের অনগ্রসর অংশদের নিয়ে প্রথম আলোর জন্মলগ্ন থেকে কাজ করে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন। এসব ক্ষেত্রে ডয়চে ভেলের সঙ্গে প্রথম আলোর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করার বিষয়ে দুজনের মতৈক্য হয়।
বৈঠকে জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নারী সমস্যা, রোহিঙ্গা সংকটসহ মানবিক সংবাদ প্রতিবেদন ও ভিডিও প্রতিবেদন অংশীদারত্বের ভিত্তিতে তৈরিতে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ ছাড়া নানা বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, গোলটেবিল বৈঠক যৌথভাবে আয়োজনেও দুই পক্ষ সম্মত হয়।
দুপুরে ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক বারবারা মাসিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রথম আলো সম্পাদক। বৈঠকে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের সংকট, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার উপর হুমকিসহ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাসহ নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
গতকাল ফোরামের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক বারবারা মাসিং এবারের সম্মেলনের স্লোগানের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিশ্ব যেভাবে কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাতে সাংবাদিকতাকে উচ্চকণ্ঠ থাকতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিতমতার প্রসারের মধ্যেও সাংবাদিকতার আবেদন না ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, তথ্যের উৎস হিসেবে মানুষ প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমেই এখনো ভরসা করছে। এটি সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জার্মানির নর্থ রাইন-ভেস্টফোলিয়া অঙ্গরাজ্যের ফেডারেল, ইউরোপীয় ও গণমাধ্যমবিষয়ক মন্ত্রী নাথানায়েল লিমিনস্কি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
কারাবন্দী জিমি লাই পেলেন ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধের বিষয়টি তুলে ধরতে এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার রক্ষকদের অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সাল থেকে ডয়চে ভেলে ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে আসছে।
বাক্স্বাধীনতা রক্ষায় সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে এবার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে হংকংয়ের জিমি লাইকে। ৭৮ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক জিমি লাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে দাঁড়িয়ে গড়ে তোলেন সংবাদপত্র অ্যাপল ডেইলি। ২০২০ সাল থেকে কারাবন্দী তিনি, জাতীয় নিরাপত্তা আইনে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি অটল অঙ্গীকারের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে জিমি লাইকে।
বাবার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণের সময় মেয়ে ক্লেয়ার লাই বলেন, ক্ষমতার সামনে সত্য উচ্চারণের মূল্য কতটা কঠিন হতে পারে, তার এক জীবন্ত স্মারক তাঁর বাবা।
ক্লেয়ার লাই বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য তাঁর বাবা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
অতীতে যাঁরা ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জর্জিয়ার সাংবাদিক তামার কিনৎসুরাশভিলি (২০২৫); ইউলিয়া নাভালনায়া ও রাশিয়ার ‘অ্যান্টি-করাপশন ফাউন্ডেশন’ (২০২৪); এল সালভাদরের অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘এল ফারো’-র প্রধান সম্পাদক অস্কার মার্তিনেজ (২০২৩); এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ-সাংবাদিক ইভজেনি মালোলেতকা ও মস্তিস্লাভ চেরনভ (২০২২)। ইভজেনি মালোলেতকা ও মস্তিস্লাভ চেরনভ ‘টুয়েন্টি ডেইজ ইন মারিউপোল’ প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ২০২৪ সালের অস্কারে ‘সেরা প্রামাণ্যচিত্রের’ পুরস্কার জিতেছিলেন।
সম্মেলনের প্রথম দিনে এই ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। আজ দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণমাধ্যমে উদ্ভাবন, প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ক্রমে জটিল হয়ে ওঠা গণমাধ্যম পরিবেশে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পরিবেশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে।