জাহেদা ফিজ্জা কবির
জাহেদা ফিজ্জা কবির

সাক্ষাৎকার: জাহেদা ফিজ্জা কবির

টেকসই উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের বিকল্প নেই

বাংলাদেশের উন্নয়ন মানচিত্রে ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’ একটি ব্যতিক্রমী নাম। দাতানির্ভরশীলতার প্রথাগত ধারণা ভেঙে করপোরেট স্বনির্ভরতার এক অনন্য মডেল তৈরি করেছে সংস্থাটি।  বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং দাতা সংস্থাগুলোর অগ্রাধিকার পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে কীভাবে পথ চলছে সাজেদা ফাউন্ডেশন। দেশের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং তাদের এনজিওর কৌশল কী? এসব বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদা ফিজ্জা কবির। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ।

প্রশ্ন

সাজেদা ফাউন্ডেশন যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন বাংলাদেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জগুলো ছিল একরকম। আজ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন জটিলতা যোগ হয়েছে। এই তিন দশকে সময়ের দাবি মেটাতে আপনারা নিজেদের কৌশলগতভাবে কীভাবে বদলেছেন?

জাহেদা ফিজ্জা কবির: আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ হুমায়ুন কবির তাঁর বাসার গ্যারেজে দুস্থ শিশুদের জন্য একটি স্কুল শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর স্ত্রীর নামে এটিকে ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’ হিসেবে নিবন্ধন করেন। আমাদের প্রতিষ্ঠাতার একটি দীর্ঘ করপোরেট পটভূমি ছিল; তিনি ফাইজার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ছিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এবং সিপিডি প্রতিষ্ঠার পেছনেও তাঁর বড় অবদান ছিল।

১৯৯১ সালে যখন নতুন ড্রাগ পলিসি হলো এবং ফাইজার নিউইয়র্ক বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি একটি চুক্তি করেন। যার ফলে ফাইজার বাংলাদেশের (বর্তমান রেনাটা লিমিটেড) ৫১ শতাংশ শেয়ার এই ফাউন্ডেশনকে দান করে যায়। সেখান থেকেই সাজেদা ফাউন্ডেশনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের কার্যক্রমে মাইক্রোফাইন্যান্স, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অতিদরিদ্রদের উন্নয়ন, ওয়াশ ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলো যুক্ত করে একটি ছোট গ্যারেজ স্কুল থেকে আজকের এই অবস্থানে এসেছি।

প্রশ্ন

এনজিও মানেই সাধারণত দাতানির্ভর বা ‘ডোনার ফান্ডেড’ একটি ধারণা আমাদের দেশে প্রচলিত। কিন্তু সাজেদা ফাউন্ডেশন প্রথম থেকেই একটি ‘করপোরেট ফিলানথ্রপি’ বা স্বনির্ভরতা মডেলে চলছে। এই মডেলে স্বনির্ভরতা অর্জন করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল এবং এটি আপনাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে কতটা ত্বরান্বিত করে?

জাহেদা ফিজ্জা কবির: প্রথাগত এনজিও বলতে যা বোঝায়, সাজেদা ফাউন্ডেশন ঠিক তা নয়। আমাদের ভিত্তি প্রথম থেকেই খুব শক্তিশালী ছিল। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বাস করতেন, সেটি করপোরেট–জগৎ হোক বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান—প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাটি শক্ত হতে হবে। আমাদের দেশের প্রতি আমাদের সবারই একটা দায়িত্ব আছে। এটি কোনো দানখয়রাত নয়, বরং দায়বদ্ধতা।

সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা নিজেদের এমনভাবে কাঠামোবদ্ধ করেছি, যাতে আমরা দাতাদের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল না হই। যেমন আমাদের মাইক্রোফাইন্যান্সের উদ্বৃত্ত আয়ের ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে আমাদের উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় করতে হয়। এ ছাড়া রেনাটার লভ্যাংশও আমাদের কার্যক্রমে বড় অবদান রাখে।

প্রশ্ন

সাজেদা ফাউন্ডেশন শুধু সরাসরি সেবা দিতে চায় না, বরং বিদ্যমান পদ্ধতি শক্তিশালী করতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সাধারণ এনজিও কার্যক্রম থেকে কেন আলাদা? দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরিতে এর ভূমিকা কী?

জাহেদা ফিজ্জা কবির: গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে এনজিও খাত অসাধারণ কাজ করেছে। কিন্তু আমাদের একটি জায়গায় ঘাটতি ছিল—আমরা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) যতটা ভেতরে ঢুকে কাজ করার দরকার ছিল, তা করিনি। আমরা সমান্তরালভাবে অনেক কাজ করেছি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরির জন্য সরকারের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করা জরুরি। যেমন আমরা ‘খান একাডেমি’র প্রতিনিধি হিসেবে সরকারি স্কুলগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। এখানে মূল চালিকা শক্তি হবে সরকার, আর আমরা হব সহায়ক শক্তি। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একটি প্রকল্প আমরা সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কাঠামোর ভেতর দিয়ে বাস্তবায়ন করছি। সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার (ম্যান্ডেট) মধ্যে আমাদের কাজগুলোকে যুক্ত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।

প্রশ্ন

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বা বয়স্কদের জন্য কেয়ার সার্ভিসের মতো বিষয়গুলো এখনো মূলধারার এনজিও কার্যক্রমে ততটা গুরুত্ব পায় না। আপনারা কেন এই অপ্রচলিত ক্ষেত্রগুলোতে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিলেন?

জাহেদা ফিজ্জা কবির: আমাদের বেশ কিছু স্বাধীন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি বা সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো এমন কিছু সেবা দেওয়া, যা বাংলাদেশে সহজলভ্য নয় বা আন্তর্জাতিক মানের নয়। মানসিক স্বাস্থ্য, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা বয়স্কদের জন্য পেশাদার সেবার বাজার বাংলাদেশে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজি এনে মানসম্মত সেবা বাজারে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি এবং এই মার্কেট তৈরি করতে অবদান রেখেছি। আগে এসব সেবা অ্যাডহক ভিত্তিতে দেওয়া হতো, আমরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছি। এখন আমাদের দেখাদেখি আরও অনেকেই এগিয়ে আসছে এবং এই বাজারটি তৈরি হওয়াই আমাদের বড় একটি সাফল্য।

প্রশ্ন

বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। আপনার দৃষ্টিতে বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলো কী?

জাহেদা ফিজ্জা কবির: বর্তমানে সবচেয়ে হতাশার জায়গা হলো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটেছে এবং নিয়মতান্ত্রিকতার তীব্র অভাব রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার এমন ক্ষতি হয়েছে, যেখান থেকে আমরা আর মূল্যবোধ বা নৈতিকতা শিখতে পারছি না। প্রতিটি স্তরে এত বেশি অবক্ষয় হয়েছে যে এর ভেতর দিয়ে কাজ করাটা ক্রমশ কঠিন ও হতাশাজনক হয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন

পেছনে তাকালে এই দীর্ঘ পথচলায় এমন কোনো মুহূর্তের কথা কি বলা যায়, যা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে তৃপ্তি দেয়? আগামী দশকে সাজেদা ফাউন্ডেশনকে কোথায় দেখতে চান?

জাহেদা ফিজ্জা কবির: আমাদের ক্ষুদ্র একটি উদ্যোগ আজ বিশাল পরিবর্তন আনতে পেরেছে, এটাই সবচেয়ে বড় তৃপ্তির জায়গা। ১৯৯৩ সালে যে ৫১ শতাংশ শেয়ারের মূল্য ছিল ৩ কোটি টাকা, সেই রেনাটা আজ একটি বিলিয়ন ডলার কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে এবং এর লভ্যাংশ দিয়ে আমরা দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা পরিচালনা করছি। সাফল্যের কথা বললে কোভিডের সময়কার কথা বলতে হয়। সাজেদা ফাউন্ডেশনই প্রথম সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে কোভিড ডেডিকেটেড প্রাইভেট হাসপাতাল চালু করেছিল। এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা ও ট্রমা কাউন্সেলিং দেওয়াটাও আমাদের বড় কাজগুলোর একটি।

আগামী দশকে আমরা প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আমাদের কাজের দক্ষতা আরও বাড়াতে চাই।

প্রশ্ন

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

জাহেদা ফিজ্জা কবির: ধন্যবাদ।