ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিমানবন্দর থেকে ফেরত যাচ্ছেন যাত্রী। আজ বুধবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিমানবন্দর থেকে ফেরত যাচ্ছেন যাত্রী। আজ বুধবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে

ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কী হবে

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের কবলে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এখন পর্যন্ত দুই বাংলাদেশি কর্মীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন আরও সাতজন।

আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র উপসাগরীয় ছয়টি দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) তেলসমৃদ্ধ ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে জিসিসিভুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশগুলো থেকে।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন।

আকাশসীমা বন্ধ, যাত্রা অনিশ্চিত

সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে বাংলাদেশ মিশন সূত্রে জানা গেছে, চলমান সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আটকে পড়েছেন বহু কর্মী।

আবার কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের ভিসা, বিশেষ করে এন্ট্রি ভিসা শেষ হওয়ার পথে, তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে নতুন করে কর্মী পাঠানো কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার কেউ কেউ ছুটি বা জরুরি প্রয়োজনে দেশে এসে আটকে গেছেন, এমন কর্মীদের ফিরে যাওয়াও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এই দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে নতুন কর্মীর যাওয়া প্রায় অনিশ্চিত হলেও ভিসা ও ফ্লাইটসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এরই মধ্যে কাতার এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্য দেশগুলোও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।

যেসব কর্মীর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, তা কীভাবে সুরাহা করা হবে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সরকারি এক কর্মকর্তা বলেন, যাঁরা বাংলাদেশ বিমানের টিকিট কেটেছেন, তাঁদের টিকিট রিশিডিউল করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া অন্যান্য এয়ারলাইনসে যাঁরা টিকিট কেটেছিলেন, তারাও যেন বাংলাদেশের কর্মীদের টিকিট রিশিডিউল করে দেয়, সে ব্যাপারে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিদেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার কেউ কেউ ছুটি বা জরুরি প্রয়োজনে দেশে এসে আটকে গেছেন, এমন কর্মীদের যাওয়াও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আজ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে

ভিসার মেয়াদ বাড়াল কাতার

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকা সব ধরনের ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাতার থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সেখানকার গণমাধ্যম দোহা নিউজ জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ সিদ্ধান্ত পরবর্তী এক মাসের জন্য কার্যকর হয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার কাতার সরকার বিদেশি কূটনীতিকদের এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, সোমবার কাতার সরকার বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য এক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিল। ওই ব্রিফিংয়ে বেশির ভাগ দেশ ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। কাতার সরকার ওই অনুরোধ বিবেচনায় নিয়ে এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাসের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) মোট প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩৪৪ কোটি টাকা, যা মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে। এর জন্য কোনো ফি দিতে হবে না এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থিত হওয়া বা কোনো আবেদন জমা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে যেসব ভিসার মেয়াদ শেষে হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধের পরই মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা প্রযোজ্য হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাতারের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের আইনি অবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

প্রবাসী আয়ে জিসিসির অবদান

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) মোট প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩৪৪ কোটি টাকা, যা মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে। এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।