এক মাসের কম সময়ে লাখ রোগী শনাক্ত

চলতি মাসের মাঝামাঝিতে যশোরে করোনা সংক্রমণ এমন অবস্থায় পৌঁছে যে, হাসপাতালের শয্যা ফাঁকা না থাকায় করোনা আক্রান্ত রোগীদের ঠাঁই হয় মেঝেসহ বারান্দায়। পুরুষ আইসোলেশন ওয়ার্ড, ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, যশোর, ১১জুন
ছবি: প্রথম আলো

দেশে করোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় এক মাসের কম সময়ে এক লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই ধাক্কায় দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৯ লাখ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৭ হাজার ৬৬৬ জনকে নিয়ে মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪ হাজার ৪৩৬। এর আগে গত ৩১ মে শনাক্ত ৮ লাখ ছাড়িয়েছিল। সর্বশেষ এক লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৯ দিনে।

দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর এর থেকে সবচেয়ে কম সময়ে এক লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত এপ্রিলে। সে সময় ১৬ দিনে শনাক্ত রোগী ৬ লাখ থেকে ৭ লাখে পৌঁছেছিল।

এপ্রিলে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ওই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে দৈনিক শনাক্ত রোগী ও করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমতে থাকে। কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝিতে ঈদুল ফিতর ঘিরে শহর থেকে গ্রামে লাখ লাখ মানুষের যাওয়া–আসা এবং মার্কেট, শপিং মলে জনসমাগম ঘটে। এর পরপর ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। কোভিড-সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বলেছে, ৫০টির বেশি জেলায় অতি উচ্চ সংক্রমণ লক্ষ করা গেছে।

কয়েক দিন ধরে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল সোমবার আগের ২৪ ঘণ্টায় ৮ হাজার ৩৬৪ জনের করোনা শনাক্তের তথ্য জানানো হয়। দেশে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটাই ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী শনাক্তের রেকর্ড।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আগের দিনের তুলনায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও এটাই এক দিনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী শনাক্তের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এই দুই দিনের আগে দেশে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত ৭ এপ্রিল ৭ হাজার ৬২৬ জন। সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৬৬৬।

দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। গত বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে সংক্রমণ শনাক্ত ছিল বেশি। এরপর সংক্রমণ কমতে থাকে। গত বছরের শেষ এবং চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণ ছিল কম। চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত টানা সংক্রমণ শনাক্ত ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এরপর আবার সংক্রমণ কমতে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্তের তিন মাস পর ১৮ জুন তা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর এক মাসের ব্যবধানে ১৮ জুলাই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখ। এর পরের এক লাখ রোগী শনাক্ত হয় ১ মাস ৯ দিনে, ২৬ আগস্ট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়ায় তিন লাখ।

গত বছরের ২৬ অক্টোবর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়িয়ে যায়। সংক্রমিতের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়ায় গত ২০ ডিসেম্বর। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখে পৌঁছাতে সময় লাগে ৫৫ দিন। এরপর ৯৯ দিনে আরও এক লাখ রোগী শনাক্ত হওয়ায় ২৯ মার্চ দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়ায়।

শনাক্তের সংখ্যা ছয় লাখ থেকে সাত লাখে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ১৬ দিন। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৪ এপ্রিল সাত লাখ পেরিয়ে যায়। আর রোগীর সংখ্যা সাত লাখ থেকে আট লাখে পৌঁছায় গত ৩১ মে, সময় লেগেছে ৪৭ দিন।

সর্বশেষ ১ লাখ রোগী শনাক্তে সময় লেগেছে ২৯ দিন। তবে চলতি জুন মাসের শুরুতেও দেশে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ছিল দেড় থেকে দুই হাজারের মধ্যে। সর্বশেষ ১ লাখ রোগীর মধ্যে প্রথম ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয় ২০ দিনে, অথচ শেষ ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে মাত্র ৯ দিনে। কয়েক দিন ধরে শনাক্তে নতুন রেকর্ড হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে সবচেয়ে কম সময়ে লাখ রোগী শনাক্তের নতুন রেকর্ড হতে পারে।

পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হওয়ায় ২২ জুন থেকে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই প্রচেষ্টায় ঢাকার আশপাশের চারটি জেলাসহ মোট সাতটি জেলায় জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের চলাচল ও কার্যক্রম ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এরপরও করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সোমবার সকাল থেকে সারা দেশে সব গণপরিবহন ও মার্কেট-শপিং মল বন্ধ করা হয়েছে। আর বৃহস্পতিবার শুরু হবে সর্বাত্মক লকডাউন, বন্ধ থাকবে সব সরকারি-বেসরকারি অফিসও।