
করোনার অভিঘাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষায় যেকোনো মূল্যে দ্রুত আরও টিকা সংগ্রহ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ আতিউর রহমান।
আতিউর রহমান বলেছেন, ‘এখন টাকা নয়, টিকাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। টিকা পাওয়া এবং মানুষকে তা দেওয়ার জন্য যা প্রয়োজন, তাই করতে হবে।’
২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মূল্যায়ন নিয়ে আজ সোমবার একটি ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন সমন্বয় ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ। সেখানে মূল প্রবন্ধ পড়েন উন্নয়ন সমন্বয়ের চেয়ারম্যান আতিউর রহমান।
আতিউর রহমান বলেন, যেকোনো মূল্যে টিকা সংগ্রহ করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতেই হবে। আর এ টিকা অল্প সময়ের মধ্যে দিতে হবে। দেরি হলে সংক্রমণ আরও দীর্ঘায়িত হবে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা করোনা মহামারিতে এখনো ধুঁকছে বাংলাদেশ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অবস্থা বাংলাদেশের মতো হলেও অনেক উন্নত দেশ এরই মধ্যে জনগণের একটি বড় অংশকে টিকা দিয়ে করোনার ধাক্কা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। করোনা থেকে রক্ষায় বাংলাদেশেও গত ফেব্রুয়ারিতে গণটিকাদান শুরু হয়েছিল। তবে ভারত সরকারের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে সে দেশের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে টিকাদান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
এখন সরকার বিকল্প উৎস থেকে টিকা আনার চেষ্টা করছে। চীন থেকে দেড় কোটি এবং রাশিয়া থেকে এক কোটি ডোজ টিকা কেনার আলোচনা এগিয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও কিছু টিকা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করে আসা আতিউর রহমান বলেন, ‘টিকা পাওয়ার জন্য এখন দরকার স্মার্ট টিকা-কূটনীতি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে অর্থ আছে। প্রয়োজনে এ টাকার সংস্থান করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর কাছে প্রচুর উদ্বৃত্ত টিকা আছে। প্রয়োজনে সেগুলো পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’
আলোচনায় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, সেই বরাদ্দ ব্যবহারে জটিলতা, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, সীমান্ত এলাকায় করোনা পরিস্থিতি—এসব নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। ৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০২১–২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপিত হয়। সেখানে স্বাস্থ্য খাতে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটি জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। থোক বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে পর্যায়ক্রমে করোনার টিকার আওতার আনার পরিকল্পনা কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে যে ধরনের বরাদ্দ দরকার ছিল, এই বাজেটে তা হয়নি বলে মনে করেন আতিউর রহমান। তিনি বলেন, এবারও স্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশের একটু বেশি বরাদ্দ আছে। এটি ৭ শতাংশ করা উচিত ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি। অথচ এ অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় সবচেয়ে কম।
ভার্চ্যুয়াল এই সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক মুশতাক রাজা চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দুঃখজনকভাবে স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক সমস্যার সমাধানের বা সংস্কারের কথা নেই। স্বাস্থ্য নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা নেই।
মোশতাক চৌধুরী বলেন, বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে দেখা গেছে, পুরোনো বরাদ্দই রাখা হয়েছে। এর কারণ আগের বরাদ্দ খরচ হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছাড়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা একটি বিষয়।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট তৈরি করার মতো ‘দক্ষ জনবলের অভাব আছে’ বলে মন্তব্য করেন নির্ধারিত আলোচক ও হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি তৌফিক মারুফ। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির ঘটনা আমাদের লজ্জিত করে।’
আমলাতন্ত্র ও কূটনীতিতে দক্ষ জনবলের অভাবের প্রসঙ্গ তোলেন অনুষ্ঠানের আরেক আলোচক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন। তিনি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য আলাদা জনস্বাস্থ্য কাঠামো তৈরির তাগিদ দেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ব্যয় করতে না পারার সমালোচনা করেন অনেকে। এর জবাব দেন আলোচক ডা. এম এ সবুর। তিনি বলেন, বাজেটে চারটি বিষয় থাকে। প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ, সংশোধিত বরাদ্দ, টাকা ছাড় ও খরচ। দেখা যায়, বাজেটে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা সংশোধিত বাজেটে গিয়ে কমে যায়। টাকা ছাড় হয় অনেক পরে। এরপর আছে খরচের প্রসঙ্গ। কিন্তু বাজেট বরাদ্দের ব্যয়ের আলোচনায় সব সময় প্রস্তাবিত বাজেটের বরাদ্দ নিয়েই আলোচনা হয়।
এখন যে জুন–জুলাইকে অর্থবছর করা হয়েছে, তা পাল্টানোর সুপারিশ করেন ডা. এম এ সবুর। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, বাজেট উত্থাপনের পরপরই বর্ষা শুরু হয়। এতে সব কাজ বন্ধ থাকে। চাইলেই অর্থবছর জানুয়ারি–ডিসেম্বর করা সম্ভব।
তবে একাধিক আলোচক প্রশ্ন তোলেন, অন্য মন্ত্রণালয়গুলোও তো একই সময় অর্থ পায়। সেখানে বাজেট ব্যয়ে সমস্যা নেই। স্বাস্থ্য খাতে কেন হয়?