করোনাভাইরাস

টিকার আওতায় নেই হিজড়ারা

হিজড়ারা করোনার টিকা নিতে চান। তবে বিভিন্ন সমস্যার কারণে তাঁদের টিকাদানের আওতায় আনা হচ্ছে না।

১ আগস্ট বেলা ১১টা। রাজধানীর মৌচাক মোড়ে যানবাহনে টাকা তুলছিলেন চারজন হিজড়া। তাঁদের একজন বীথি হিজড়া। তাঁর একটি স্মার্টফোন আছে। তবে তিনি জানেন না কীভাবে করোনার টিকার নিবন্ধন করতে হয়। বীথি জানান, তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা টিকা নিতে চান। কিন্তু উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না।

বীথির মতো করোনার টিকা কার্যক্রমের বাইরে আছেন হিজড়ারা। তাঁরা করোনার টিকা নিতে চান। তবে বিভিন্ন সমস্যার কারণে তাঁদের টিকাদানের আওতায় আনা হচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হিজড়াদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে অধিদপ্তরের এখনই পরিকল্পনা নেই।

দেশে করোনা টিকার নিবন্ধন শুরু হয় গত ২৭ জানুয়ারি। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮ বছর বয়সী যেকোনো মানুষ এখন টিকা নিতে পারছেন। দেশে এখন অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম, মডার্না ও ফাইজার—এই চার ধরনের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ করোনার টিকা নিয়েছেন। ছয় মাস পেরোলেও টিকা কর্মসূচিতে ঠাঁই পাননি হিজড়ারা।

কয়েকজন হিজড়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনার টিকা নিতে মূলত কয়েকটি বাধায় পড়তে হয় তাঁদের। টিকা নিতে ভয় পাওয়া, জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা, বয়সসীমা নিয়ে বিভ্রান্তি, সুরক্ষা অ্যাপে হিজড়া অপশন না থাকা—মূলত এই সমস্যাগুলোর কারণে তাঁরা টিকা নিতে নিরুৎসাহিত হন। টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইনে সুরক্ষা ওয়েবসাইট ও অ্যাপে অগ্রাধিকার তালিকায় ২৫টি ক্যাটাগরি আছে। তবে এর মধ্যে হিজড়ারা অন্তর্ভুক্ত নেই।

হিজড়াদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে সচেতন সমাজসেবা হিজড়া সংঘ। এ সংগঠনটিতে বর্তমানে ৪৫০ জন সদস্য আছেন। তাঁরা বলছেন, করোনাকালে তাঁদের অনেকেই জ্বর, সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত হয়েছেন। অসুস্থ হলে তাঁরা চিকিৎসকেরা পরামর্শে ওষুধ সেবন করে থাকেন। কারও কারও করোনা পরীক্ষাতে পজিটিভ এসেছে।

হিজড়া সংঘের সম্পাদক ইভান আহমেদ বলেন, ‘আমি গত বছরের মে মাসে নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। পরে নেগেটিভ হয়েছি। আমি এখনো করোনার টিকা নিতে পারিনি। টিকা নিবন্ধনের অ্যাপে পুরুষ ও নারীর ঘর আছে। কিন্তু হিজড়াদের কোনো ঘর নেই। স্বীকৃতিই যদি না থাকে, তাহলে আমরা কীভাবে করোনার টিকা নেব?’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হিজড়াদের করোনার টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনতে অধিদপ্তরের এখনো পরিকল্পনা নেই। করোনার টিকা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে হিজড়ারা অগ্রাধিকার পাবেন। তবে তাঁদের কোনো সমিতি বা সংগঠন থাকলে, তাঁরা সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসে এসে জানালে টিকা দেওয়ার দ্রুত ব্যবস্থা করা হবে।

দেশে এত বড় একটা টিকা কার্যক্রম চলছে। অথচ তাঁরা একেবারেই উপেক্ষিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত দ্রুতই তাঁদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা।
জাকির হোসেন, বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কার্যকরী সদস্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, হিজড়াদের মধ্যে যাঁদের বয়সসীমা আছে, তাঁরা সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধন করে অন্যদের মতো করোনার টিকা নিতে পারবেন। এতে বাধা নেই। হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা কোনো উন্নয়ন সংস্থা এগিয়ে এলে এই বিষয়টি আরও সহজ হবে।

দেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কত: দেশে হিজড়ার সংখ্যা কত—এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো হালনাগাদ তথ্য বা জরিপ নেই। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০১৩ সালের করা এক জরিপ বলছে, এদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনের হিসাবে, সারা দেশে এই সংখ্যা লাখ ছাড়াবে।

২০১৯ সালে এই হিজড়ারা স্বতন্ত্র লিঙ্গীয় পরিচয়ে ভোটাধিকার লাভ করে। এখন তাঁরা পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রে লিঙ্গীয় পরিচয় হিসেবে হিজড়া উল্লেখ করতে পারেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে লিঙ্গীয় স্বীকৃতি লাভ করলেও তাঁরা এখন পর্যন্ত সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। কারণ, তাঁদের অধিকাংশেরই জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় নেই। তেমনই একজন রাজধানীর মান্ডা এলাকার হিজড়া শাহনেওয়াজ শ্রাবন্তী। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও টিকা পাননি। তিনি বলেন, ‘একদিন মুগদা হাসপাতালে গিয়েছি। সেখানে নিবন্ধন করার সময় অ্যাপে দেখায় আমি নাকি পুরুষ। কিন্তু আমি তো পুরুষ না, হিজড়া। অ্যাপে ওই অপশন নেই।’

রাজধানীর মান্ডা এলাকায় কথা হয়, নুপূর হিজড়ার সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এই এলাকায় ৬২ জন হিজড়া থাকেন। আমরা করোনার টিকা দিতে চাই। কিন্তু আমাদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। অনলাইনে নিবন্ধনও আমরা বুঝি না। নাগরিক হিসেবে আমাদের বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু আমাদের কেউ নেই।’

হিজড়াদের কর্মসংস্থান মূলত গণপরিবহন, রাস্তাঘাট, বাজার কিংবা বাসায় ঘুরে ঘুরে চাঁদা আদায় করা, নবজাতক নাচানো, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে নাচা। কেউ কেউ যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে থাকেন। এগুলোর প্রতিটিই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে মতো দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, হিজড়ারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। তবে তাঁদের করোনা শনাক্ত, মৃত্যুর হার কত—এ নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কার্যকরী সদস্য ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, হিজড়াদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। দেশে এত বড় একটা টিকা কার্যক্রম চলছে। অথচ তাঁরা একেবারেই উপেক্ষিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত দ্রুতই তাঁদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা।