করোনা মহামারি

দেশে ভারতীয় ধরনের সামাজিক সংক্রমণ

দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। করোনা রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ।

সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরনের সামাজিক সংক্রমণ ঘটে গেছে। সীমান্তের একটি জেলায় সামাজিক সংক্রমণ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

গতকাল শনিবার আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন প্রথম আলোকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন কিছু মানুষ নতুন স্ট্রেইনে (ভারতীয় ধরন) আক্রান্ত হয়েছেন, যাঁদের ভারত ভ্রমণের ইতিহাস নেই। এটা নতুন স্ট্রেইনের সামাজিক সংক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণের খবর এমন সময় প্রকাশ পেল, যখন ভারতের সীমান্তের বেশ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়তির দিকে জানিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ খবর দিচ্ছে। একই সঙ্গে সারা দেশে গত এক সপ্তাহে শনাক্ত হওয়া রোগী বেড়েছে ২২ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক পরামর্শক মুজাহেরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে দিতে পারেনি বলে সামাজিক সংক্রমণ ঘটে গেছে। তারা প্রায় দেড় বছর সময়ে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ে (আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা) সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। মানুষজনকে তারা উদ্বুদ্ধও করতে পারেনি। তাই পরিস্থিতি আবারও খারাপ দিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

ভারতীয় ধরনের সামাজিক সংক্রমণ

গত শুক্রবার করোনাভাইরাসের জিন বিশ্লেষণের উন্মুক্ত বৈশ্বিক তথ্যভান্ডার জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটার (জিআইএসএআইডি) ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্তের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

তাতে নতুন করে ১৩ জনের শরীরে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়। এই ১৩ জনের মধ্যে ৭ জনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার। এ ছাড়া খুলনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা ও চুয়াডাঙ্গার একজন করে করোনার ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাতজনসহ খুলনার একজনের ভারত ভ্রমণের ইতিহাস নেই। এই ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছে আইইডিসিআর।

৮ মে বাংলাদেশের দুই ব্যক্তির শরীরে করোনার ভারতীয় ধরনের (বি.১.৬১৭.২) অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাঁরা দুজনই পুরুষ এবং উভয়ই ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন। এঁদের একজন ছিলেন খুলনার, অন্যজন ঢাকার।

খুলনায় ভারতীয় ধরনের আক্রান্তের সংখ্যা এ পর্যন্ত চারজন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দুই বছরের শিশুসহ তিনজনের ভারত ভ্রমণের ইতিহাস আছে। সর্বশেষ ব্যক্তি সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ভ্রমণ করেননি।

রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, উৎস জানা না গেলে তাকে সামাজিক সংক্রমণ বিবেচনা করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাতজন কীভাবে সংক্রমিত হয়েছেন, তা আইইডিসিআর জানতে পারেনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে বলেন, ‘সাতজনের পাঁচজন সদর ও দুজন শিবগঞ্জ উপজেলার। তাঁরা সবাই বাড়িতে আছেন এবং সুস্থ আছেন। আমরা আবার তাঁদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করব। তাঁদের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।’

তবে খুলনার সিভিল সার্জন নিয়াজ মোহাম্মদ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, খুলনা জেলার কেউ ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত হয়েছেন, এমন তথ্য তাঁর কাছে নেই।

সীমান্তে সংক্রমণ পরিস্থিতি

২৪ মে সাত দিনের জন্য দেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে লকডাউন ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। ঈদের পর থেকেই জেলায় সংক্রমণ দ্রুত বেড়ে যায়। একপর্যায়ে দেখা যায় নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ দুজনের নমুনা পরীক্ষা করলে একজন করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হতে থাকে।

সর্বশেষ শুক্রবারের নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে অবশ্য পরিস্থিতির সামন্য উন্নতি দেখা গেছে। ওই দিন ১১৩টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয় ৩৯ জনের। অর্থাৎ শনাক্তের হার ছিল ৩৫ শতাংশ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশপাশের জেলাগুলোতেও শনাক্তের হার বেশি হতে দেখা গেছে। একই দিনের নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ জেলার শনাক্তের হার ছিল যথাক্রমে ৪৬, ৪১ ও ৫০ শতাংশ।

নওগাঁর সিভিল সার্জন এ বি এম আবু হানিফ প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘেঁষা নওগাঁর উপজেলাগুলোতে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। এটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁরা নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

প্রায় দেড় মাস আগে প্রতিবেশী দেশ ভারতে সংক্রমণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার খবর আসে। জানা যায়, ভারতের মানুষ রূপান্তরিত নতুন ধরনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। বলা হতে থাকে, ভারতীয় এই ধরনের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতাও বেশি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত। প্রতিদিন স্থল ও বিমানবন্দর দিয়ে দুই দেশের মানুষ যাতায়াত করত। ভারত থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ প্রথমে ভারতের সঙ্গে বিমান চলাচল, পরে স্থলবন্দর বন্ধ করে দেয়। পরে স্থলবন্দর চালু করলেও মানুষ চলাচল সীমিত রেখেছে।

সারা দেশের সংক্রমণ

পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় ঢাকাসহ বড় বড় শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ সারা দেশে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় যানবাহনে বা ফেরি পারাপারে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। জনস্বাস্থ্যবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ঈদের পর সংক্রমণ বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত দুই সপ্তাহে দেশে সার্বিকভাবে সংক্রমণ বাড়ছে। এই বছরের ২০তম সপ্তাহের তুলনায় ২১তম সপ্তাহে রোগী শনাক্ত বেড়েছে ২২ শতাংশ। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষা বেড়েছে ৬ শতাংশ। এর আগের সপ্তাহেও শনাক্তের হার বাড়তে দেখা গিয়েছিল।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনায় দেশে মারা গেছেন ৩৮ জন। এই সময় শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৩ জন। শনাক্তের হার ৮ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্যবিদ মুজাহেরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জরুরি ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকার সব উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অক্সিজেন, অক্সিজেন মাস্ক ও নাজাল ক্যানুলার যেন কোনো ঘাটতি না থাকে। পাশাপাশি কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।