জনগণের কাছ থেকে বিমা পলিসির টাকা নিয়ে নিজেরাই তা খরচ করে ফেলছে দেশের জীবনবিমা কোম্পানিগুলো। একই কাজ করছে জীবনবিমা পলিসি করার রাষ্ট্র খাতের একমাত্র সংস্থা জীবন বীমা করপোরেশনও (জেবিসি)। সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে এক কোটি ৪০ লাখ জীবনবিমা পলিসি রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সবাইকে এই খরচ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বলেছে।
দেশে বর্তমানে রাষ্ট্র খাতের জেবিসি, বিদেশি মেটলাইফ আলিকো এবং ২৯টি বেসরকারি জীবনবিমা কোম্পানি রয়েছে। তবে ব্যবসা করছে মূলত জেবিসি, আলিকো ও বাকি ১৬টি কোম্পানি। অন্য ১৩টি মাত্র ব্যবসা শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় গত বছর এদের লাইসেন্স দেয় সরকার।
পলিসি গ্রাহকদের কাছ থেকে যে টাকা সংগ্রহ করা হয়, তার বিপরীতে প্রতিটি কোম্পানিরই শক্তিশালী জীবন তহবিল বা লাইফ ফান্ড থাকার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু গ্রাহকদের স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে কেউই তা মেনে চলছে না।
আইডিআরএ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, পাঁচ বছরে (২০০৯-২০১৩) জেবিসিসহ ১৫টি জীবনবিমা কোম্পানি এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০১৩ সালেই অতিরিক্ত খরচ করেছে ৩৫০ কোটি টাকা। অথচ এ টাকার ৯০ শতাংশেরই মালিক হচ্ছেন পলিসি গ্রাহকেরা।
পলিসি গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ কোন খাতে কত খরচ হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে গত জুনে সব জীবনবিমা কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছিল আইডিআরএ। সে অনুযায়ী কোম্পানিগুলো আর্থিক সূচকসংবলিত প্রতিবেদন দাখিল করে আইডিআরএর কাছে। ওই প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকদের অর্থ খরচের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
আইডিআরএ সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, সরকার যত টাকা খরচ করার এখতিয়ার দিয়েছে, মেটলাইফ আলিকো খরচ করেছে তার চেয়েও কম। আর গোল্ডেন লাইফ ও বায়রা লাইফ—এই দুটি কোম্পানি তাদের খরচের কোনো তথ্যই আইডিআরএকে জানায়নি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিমা আইন ও বিমা বিধি অনুযায়ী ব্যবসা শুরুর বয়স ১০ বছর হলে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয়ের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করতে পারে জীবনবিমা কোম্পানিগুলো। এই খরচের মধ্যে বেতন, কমিশন, অফিস ভাড়াসহ সব ধরনের বিল অন্তর্ভুক্ত। এর পরের বছরের (নবায়নকৃত বা রিনিউয়াল) প্রিমিয়াম আয় থেকে খরচ করা যায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। মেটলাইফ আলিকো বাদে সবাই এই সীমারেখা লঙ্ঘন করেছে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আইন লঙ্ঘন করে কম-বেশি সব জীবনবিমা কোম্পানিই মাত্রাতিরিক্ত খরচ করছে। এই খরচের ফাঁকে আরও কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে কি না, যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
শেফাক আহমেদ আরও বলেন, কোম্পানিগুলো এত বেশি টাকা খরচ করছে বলেই এক কোটিরও বেশি বিমা পলিসি গ্রাহক ভালো বোনাস পাচ্ছেন না। এতে কী ক্ষতি হচ্ছে জানতে চাইলে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি কোম্পানি যদি ১০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে, এর মধ্যে নয় কোটি টাকাই পলিসি গ্রাহকের। বাকি এক কোটি টাকা শেয়ারধারীদের অংশ। ওই কোম্পানি বেশি খরচ করলে মুনাফার অংশ কমবে। এতে পলিসি গ্রাহকদের জন্য কোম্পানির বোনাস দেওয়ার সক্ষমতাও কমবে। শেয়ারধারীরাও কম লভ্যাংশ পাবেন।
খরচ কমিয়ে আনতে ২০১২ সালেই কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছিল আইডিআরএ। কোম্পানিগুলো তখন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল, এ রকম খরচ আর করবে না। কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করেনি। উল্টো ২০১৩ সালে কয়েকটি কোম্পানি বেপরোয়া খরচ করেছে।
বেশি খরচ ফারইস্ট ও পপুলার লাইফের: পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেছে ফারইস্ট লাইফ। ২০১৩-এর কোম্পানিটির নিট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৭০৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এ থেকে ১৭৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা খরচের এখতিয়ার থাকলেও করেছে ২২৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
ফারইস্ট লাইফের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম এ জন্য গত বছরের রাজনৈতিক সহিংসতাকে দায়ী করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সহিংসতার কারণে ২০১৩ সালে ব্যবসা কম হয়েছে। তাই খরচটা চোখে পড়ছে। যদিও আগের তিন বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকা সত্ত্বেও তারা ৮২ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছিল।
২০১৩ সালে পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্সের ২১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা খরচের এখতিয়ার থাকলেও করেছে ২৫২ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি ২৩৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা বেশি খরচ করেছে।
একইভাবে পাঁচ বছরে পদ্মা লাইফ ১৩৭ কোটি ৫৮ লাখ, প্রগতি লাইফ ১২০ কোটি ৬৮ লাখ, সন্ধানী লাইফ ১১৩ কোটি, সানলাইফ ৭৩ কোটি ৪৬ লাখ, মেঘনা লাইফ ৬৯ কোটি ৩৩ লাখ, প্রাইম লাইফ ৫৬ কোটি, রূপালী লাইফ ৫০ কোটি ২৩ লাখ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ৪৮ কোটি ৮২ লাখ, ডেল্টা লাইফ ৪৬ কোটি ৬০ লাখ, হোমল্যান্ড ৩৭ কোটি ২৪ লাখ, ন্যাশনাল লাইফ ২৩ কোটি ৭৮ লাখ এবং প্রগ্রেসিভ লাইফ ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশন পাঁচ বছরে অতিরিক্ত খরচ করেছে ১৭৪ কোটি টাকা। সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরীক্ষিৎ দত্ত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এযাবৎ খরচ বেশি হয়েছে। আগামীতে আমরা তা কমিয়ে আনার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।’ এর বাইরে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
আইডিআরএ বলছে, কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেপরোয়া খরচ করেছে পদ্মা ইসলামী লাইফ। ২০১৩ সালে কোম্পানিটির খরচের এখতিয়ার ছিল ৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকা, কিন্তু খরচ করেছে ৭৮ কোটি চার লাখ টাকা। অতিরিক্ত খরচের হার ৭৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। প্রগতি লাইফ বেশি খরচ করেছে ৭১ শতাংশ, প্রাইম ইসলামী লাইফ ৫১ শতাংশ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ৪৮ শতাংশ এবং প্রগ্রেসিভ লাইফের অতিরিক্ত খরচের হার ৪৩ শতাংশ।