সিরাজগঞ্জ

ডেন্টাল ক্লিনিক ১১৫টি, নিবন্ধিত মাত্র দুটি

সিরাজগঞ্জ জেলার ১১৫টি ডেন্টাল ক্লিনিকের মধ্যে মাত্র ২টির নিবন্ধন আছে। বাকি ১১৩টি ক্লিনিকেরই কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। এ ছাড়া নামসর্বস্ব দন্ত চিকিৎসক দিয়েই এসব ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসক হিসেবে কাজ করা অধিকাংশই ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণধারী অথবা হাতুড়ে চিকিৎসক।
ক্লিনিকগুলোকে নিবন্ধনভুক্ত হতে ৬ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার এবং গতকাল বৃহস্পতিবার এই ক্লিনিকগুলো ঘুরে দেখা গেছে, জেলা শহরে প্রায় ৩৫টি ডেন্টাল ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মুজিব সড়কেই রয়েছে ১৪টি। এর মধ্যে শুধু মোল্লা ডেন্টাল ক্লিনিক এবং তালুকদার ডেন্টাল ক্লিনিকেরই অনুমোদন রয়েছে। তবে এ দুটিতেও কোনো বিডিএস চিকিৎসক ও দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই। আবার অন্য ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত চেম্বারগুলোতে যাঁরা চিকিৎসক হিসেবে আছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই চিকিৎসা দেওয়া থেকে শুরু করে দাঁত তোলা, অস্ত্রোপচার—সবই করছেন। এ চিত্র জেলা শহরসহ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও।
সিভিল সার্জনের কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার অধিকাংশ ক্লিনিকে বিডিএস ডিগ্রিধারী ডেন্টাল সার্জন নেই। দক্ষ টেকনিশিয়ানও নেই। যাঁরা চিকিৎসা দিচ্ছেন, তাঁরাই দাঁত তুলছেন। তাঁরাই আবার ফিলিং থেকে দাঁত বা মাড়ির যেকোনো ধরনের অস্ত্রোপচার করছেন। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো ল্যাবরেটরি। বিভিন্ন অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের নাম ব্যবহার করে আকর্ষণীয় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এসব ক্লিনিক পরিচালনা করা হচ্ছে। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা নিজের নামের আগে ডেন্টিস্ট শব্দটি যোগ করে চিকিৎসা দিচ্ছেন।
অনুমোদিত মোল্লা ডেন্টালের স্বত্বাধিকারী মজনু মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী শাহনাজ মোল্লা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দাঁতের চিকিৎসার ওপর ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানও নেই। একজন বিডিএস চিকিৎসকের নাম সাইনবোর্ডে লেখা থাকলেও তিনি আসেন না। এ বিষয়ে মজনু মোল্লা বলেন, ‘ডিপ্লোমা পাসের সনদ দিয়ে আবেদন করেই লাইসেন্স পেয়েছি। বিডিএস চিকিৎসক অন্য একটি প্রশিক্ষণে থাকায় আপাতত তিনি আসছেন না।’
অপর অনুমোদনপ্রাপ্ত তালুকদার ডেন্টাল ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী মোস্তাক আহমেদের নিজেরই কোনো সনদ নেই। প্রায় ১৫ বছর আগে শহরের ইসলামিয়া কলেজ রোডের এক ডেন্টাল সার্জনের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে সেই সার্জন অন্যত্র চলে গেলে তালুকদার ডেন্টাল অ্যান্ড সাপ্লাই নামে প্রতিষ্ঠান খুলে নিজেই চিকিৎসা চালাচ্ছেন।
মোস্তাক আহমেদ বলেন, তাঁর নিজের কোনো ডিগ্রি না থাকলেও সম্প্রতি দাঁতের চিকিৎসার ওপর দুজন ডিপ্লোমাধারীকে ক্লিনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মূলত তাঁরাই রোগী দেখেন। তিনি কেবল দাঁত বাঁধাইসহ ছোটখাটো কাজগুলো করেন।
একই সড়কের কলি ডেন্টাল ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী মনোরঞ্জন প্রামাণিক ১৯৮২ সালে ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে তিন মাসের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স করেছেন। জামাতা সুব্রত পোদ্দার তাঁর সঙ্গে রোগী দেখেন। রিপন চন্দ্র দাস নামের অপর এক সহকারী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে কলি ডেন্টাল নামে আরেকটি ক্লিনিক খুলেছেন। সুব্রত পোদ্দার বলেন, ‘একজন বিডিএস চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কয়েক বছর কাজ করেছি। পরে মনোরঞ্জন প্রামাণিকের কাছে কাজ শিখে তাঁর সঙ্গে কাজ করছি।’
ক্লিনিক মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদর, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে গড়ে ওঠা ১১৫টি ডেন্টাল ক্লিনিকের মধ্যে সাতজন বিডিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক আছেন। শহরের ৩৫টিতে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি ডিগ্রিধারী টেকনিশিয়ানরা রোগী দেখছেন। অন্যগুলোতে টেকনিশিয়ান তো দূরের কথা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো লোকও নেই।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন শেখ মো. মনজুর রহমান বলেন, সব ডেন্টাল ক্লিনিকের আউটডোর হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক। তবে অবশ্যই একজন বিডিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের সেখানে দায়িত্বে থাকতে হবে। সিরাজগঞ্জের নিবন্ধনপ্রাপ্ত দুই ক্লিনিক এসব শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও কীভাবে লাইসেন্স পেল, তা তদন্ত করে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, সব ডেন্টাল ক্লিনিকের মালিকদের নিবন্ধন করার জন্য ৬ অক্টোবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ১৫ দিনের মধ্যে তাঁদের নিবন্ধন নিতে হবে। এই সময়ের মধ্যে যেসব ডেন্টাল ক্লিনিক নিবন্ধন নিতে ব্যর্থ হবে, তাদের ক্লিনিক বন্ধসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের মহাসচিব মাসুদুর রহমান বলেন, লাইসেন্স গ্রহণসংক্রান্ত সিভিল সার্জনের চিঠি তাঁরা পেয়েছেন।