বিদেশ থেকে মেশিন এনে ছাপা হচ্ছিল জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প

চার বছর ধরে জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি তৈরি করছিল একটি চক্র। চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার হয়
ছবি: সংগৃহীত

চার বছর ধরে জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি তৈরি করছিল একটি চক্র। এমনকি এই স্ট্যাম্প তৈরি করতে দুই বছর আগে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল কলেজ রোডে ছাপাখানাও স্থাপন করা হয়। ছাপাখানার মেশিনটি জার্মানিতে তৈরি। এ ধরনের জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি ব্যবহারের ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আজ শুক্রবার ভোর পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প, কোর্ট ফিসহ চারজনকে আটক করা হয়। পরে এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা হলে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আজ দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বিস্তারিত জানান।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আবু ইউসুফ ওরফে পারভেজ, আতিয়ার রহমান, নাসির উদ্দিন ও নুরুল ইসলাম।

অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আশরাফউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মতিঝিল থেকে চক্রের প্রধান ইউসুফ ওরফে পারভেজ ও আতিয়ার রহমান রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মালিবাগের আবুল হোটেল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নাসির উদ্দিনকে। তাঁরা জানান, চক্রের অন্যতম সদস্য নুরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থান করছেন। পরে সেখান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, মাতুয়াইল কলেজ রোডের দক্ষিণপাড়া এলাকার একটি বাসায় জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি তৈরির কারখানা রয়েছে। পরে সেই কারখানায় অভিযান চালানো হয়।

ছাপাখানা থেকে আরও বিপুল পরিমাণ কাগজ জব্দ করা হয়, যা দিয়ে অন্তত শতকোটি টাকার জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প বানানো সম্ভব ছিল

ইউসুফ একসময় বাসচালকের সহকারী ছিলেন। আর নুরুল ইসলাম একসময় মতিঝিলের আরামবাগে প্রিন্টিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই ব্যবসায় লোকসান হচ্ছিল তাঁর। কয়েক বছর আগে তাঁদের পরিচয় হয়। দুজনে মাতুয়াইলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে গোপনে ছাপাখানা স্থাপন করে জাল রেভিনিউ ও জাল স্ট্যাম্প তৈরি শুরু করেন। তাঁদের সহযোগী আতিয়ার ও নাসির। তাঁরা এসব দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেন। নাসির অটোরিকশা চুরির সিন্ডিকেটের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

ছাপাখানা থেকে বিভিন্ন মূল্যমানের ১৩ লাখ ৪০ হাজার জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়, যার মূল্য প্রায় ২০ কোটি ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের ১৯ হাজার ৪৮০টি জাল কোর্ট ফি; নগদ ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা; ১১৪ গ্রাম স্বর্ণালংকার; ৮টি মুঠোফোন; ডাক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১১টি সিল; স্ট্যাম্প পরীক্ষার ২টি ইলেকট্রনিক মেশিন; বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ৩০০ রসিদের কপি; ১টি বড় প্রেস মেশিন; ২টি কাটিং মেশিন; ১টি ডাইং মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের ১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকার ১৮টি চেকের পাতা এবং ইউসুফের নামে ২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ৩টি চেক বই পাওয়া যায়। ছাপাখানা থেকে আরও বিপুল পরিমাণ কাগজ জব্দ করা হয়, যা দিয়ে অন্তত শতকোটি টাকার জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প বানানো সম্ভব ছিল।

উদ্ধার করা হয় নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, সিল,ইলেকট্রিক মেশিনসহ অনেক কিছু

ডিবি কর্মকর্তা এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, তিন ধাপে এসব জাল স্ট্যাম্প ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হতো। বরিশাল, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার নামে খাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, তাঁরা এসব জাল স্ট্যাম্প দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন।

বিভিন্ন শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, ব্যাংক-বিমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমনকি আদালতেও এসব জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করা হতো বলেও জানান ডিবির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা হয়তো বিষয়টা জানেনও না। এগুলো কেনার দায়িত্বে থাকা পিয়ন বা ক্লার্ক কম দামে এগুলো কিনে প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। এই চক্রে আরও অনেকেই জড়িত আছেন। তাঁদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে। সবাইকে রেজিস্টার্ড জায়গা থেকে স্ট্যাম্প কেনার পরামর্শও দেন তিনি।