সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

৮৫ ভাগ জায়গাই বেদখল

মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ৩০ একর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। এটা হাসপাতালটির মোট সম্পত্তির ৮৫ শতাংশ। এখন হাসপাতালের প্রায় দুই একরের খেলার মাঠটিও দখলের চেষ্টা চলছে।
এলাকার বাসিন্দা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই দখল-প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ এক আওয়ামী লীগ নেতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত শতকের ষাটের দশকে মহাখালীতে ট্রপিক্যাল মেডিসিন ইনস্টিটিউট নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার পর ৩৫ একর জমি এবং একটি সাততলা ভবন নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ওই ভবন আর একটি স্টাফ কোয়ার্টার নিয়ে হাসপাতালের দখলে আছে মাত্র ৫ একর জায়গা। বাকি জায়গা দখল করে বিভিন্ন সময়ে সেখানে গড়ে উঠেছে অন্তত তিন হাজার বস্তিঘর, কাঁচাবাজার, খাবার হোটেলসহ বিভিন্ন ধরনের নিত্যপণ্যের দোকান। জায়গাটি এখন সাততলা বস্তি হিসেবেই পরিচিত।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, খেলার মাঠটির অবস্থান হাসপাতালের দক্ষিণ পাশের ফটক থেকে বেরিয়ে বাঁ পাশে। সেখানে জায়গায় জায়গায় মাটি এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। মাঠের এক কোণে রিকশার গ্যারেজ করা হয়েছে।
মাঠের ভেতর মাটির স্তূপের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাছির ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আতর আলীর যোগসাজশে নতুন এই দখল কার্যক্রম চলছে। আতর আলী ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাততলা বস্তি ইউনিটের প্রচার সম্পাদক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাছির প্রথম আলোকে বলেন, এই এলাকায় একটাও খেলার মাঠ নেই। এখন মাঠটি সংস্কার করে খেলাধুলার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল। সেখানে হাসপাতালের কিছু কর্মচারী রিকশা গ্যারেজ করে ভাড়া দিত। অনেকে সেখানে ঘর তুলতে চেয়েছে। আমিই এত দিন সেটা হতে দেই নাই।’
কিন্তু আরেক অভিযুক্ত আতর আলী বললেন ভিন্ন কথা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাঠে একটা ক্লাব তৈরির জন্য মাটি ফেলা হচ্ছে।
এই আতর আলীর বিরুদ্ধে বস্তি নিয়ন্ত্রণসহ হাসপাতালের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে ব্যবসা করা, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টারকে হুমকি প্রদান ও হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে ফুটপাত দখল করে একটি মাজার তৈরির অভিযোগ আছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আতর আলী বলেন, ‘আমি এলাকায় কিছু বিচার-সালিস করি, এইটা ঠিক আছে। কিন্তু বস্তি নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগ, যুবলীগের কর্মীরাই করে। আমিও যেহেতু দল করি, তাই এগুলো দেখেও না দেখার ভান করতে হয়।’ বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় হুমকির বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘হাসপাতালের আগের তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিয়েই দলের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাততলা ইউনিট অফিসের ছয়টা ফ্যান ও লাইট জ্বালানোর জন্য লাইন টানা হয়েছিল। সেই লাইন কেটে দেওয়ার পর কিছু কথা-কাটাকাটি হয়েছে। এর বেশি কিছু না।’ আর ফুটপাত দখল করে মাজার তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এইটা সত্য যে আমি খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির একজন ভক্ত। তবে মাজার আমি করি নাই। এলাকার পোলাপান করছে।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তিন দিকের দেয়াল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পাকা-আধপাকা দোচালা টিনের ঘর। ঘরগুলোর কোনোটির গায়ে হোল্ডিং নম্বর না থাকলেও প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ এবং কোথাও কোথাও গ্যাসের সংযোগ আছে। এই প্রতিটি ঘরের গড় ভাড়া দেড় হাজার টাকা। সে হিসাবে এই বস্তি থেকে মাসে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ভাড়া ওঠে। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, এই ঘরগুলোর বেশির ভাগের মালিক হাসপাতালের প্রভাবশালী কিছু কর্মচারী এবং আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা-কর্মীরা।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক শাহ আলম তালুকদার বলেন, ‘একটা বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে যে পরিবেশ এখানে থাকা দরকার, তার পুরোটাই নষ্ট হয়েছে এই দখলদারির কারণে। এটা বন্ধ করে উপযুক্ত পরিবেশ আমাদের দিতে হবে। দখলদারির সঙ্গে যেই জড়িত হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসক-কর্মচারীদের সঙ্গে এখানে আসা রোগীদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে।’