'শহীদ হামজা ব্রিগেড' নতুন জঙ্গি সংগঠন?

‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ (এসএইচবি) নামে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নতুন একটি জঙ্গি সংগঠন খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে র্যাব। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য কী, মূল নেতা কে তা জানাতে না পারলেও র্যাবের দাবি, সংগঠনের ২৫ জন সদস্য রয়েছে। এঁদের ২৪ জনই আটক হয়েছেন। র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য জানান।
বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গুলিসহ জঙ্গি সন্দেহে তিনজন এবং এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটকের তথ্য জানাতে গতকাল সোমবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র্যাব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে নতুন জঙ্গি সংগঠনের তথ্য র্যাব পেয়েছে দাবি করলেও তাঁদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
র্যাবের দাবি, ২০১৩ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রামের নগরের ফয়’স লেক এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় বসে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ গঠন করে জঙ্গিরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে কলেজ ও মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রদের এই সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। পরে তাদের পাহাড়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
লে. কর্নেল মিফতাহ জানান, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী সদরের মাদরাসাতুল আবু বকরে অভিযান চালিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ধর্মীয় বইসহ জঙ্গি সন্দেহে ১২ জনকে আটক করা হয়। রিমান্ডে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ ফেব্রুয়ারি বাঁশখালীর লটমণি পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র-গুলিসহ পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ ফেব্রুয়ারি হালিশহর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম, ৭৬টি হাতবোমাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব জঙ্গিদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের র্যাব জানতে পারে, শহীদ হামজা ব্রিগেড নামে জঙ্গিরা নতুন একটি সংগঠন করেছে।
তবে বাঁশখালীর লটমণি পাহাড়ের ‘জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ অভিযান পরিচালনার পর র্যাব জানিয়েছিল, মাওলানা মোবারক ও আবদুল আজিজ নামে দুই জঙ্গি সংগঠনটি পরিচালনা করতেন। দুজনকে ধরতে পারলে বিস্তারিত জানা যাবে। যদিও আবদুল আজিজ ৭ জানুয়ারি থেকেই নাশকতার মামলায় চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দী ছিলেন।
নতুন এই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আইএস বা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাব-৭ অধিনায়ক জানান, এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।
যেভাবে গ্রেপ্তার : র্যাব জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব জানতে পারে, চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের বিপরীতে আবাসিক হোটেল মিডটাউনে জঙ্গিরা অস্ত্র কেনাবেচার জন্য জড়ো হয়েছে। গত রোববার সকাল ১০টার দিকে হোটেলে অভিযান চালিয়ে জঙ্গিদের অস্ত্র সরবরাহকারী জেলার সাতকানিয়ার উত্তর কাঞ্চনা গ্রামের মোজাহের হোসেন মিয়াকে এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের গুলগাঁও গ্রামের সাব্বির আহমেদকে আটক করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে চারটি বিদেশি পিস্তল, চারটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, এক হাজার রাউন্ড পয়েন্ট ২২ বোরের গুলি, ১২ রাউন্ড ৭ দশমিক ৬৫ পিস্তলের গুলি এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে দুজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন রাত ১২টার দিকে এ কে খান মোড়ের সামনে থেকে ঢাকার ধামরাই থানার ইন্দরা নয়াচর এলাকার কামাল উদ্দিন ওরফে মোস্তফা ও নওগাঁর পরশা থানার আশরাফ আলী ওরফে আদনানকে আটক করা হয়। হোটেলে অস্ত্রসহ তাঁদের দুই সহযোগী আটক হওয়ার খবর পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে এ দুজন ধরা পড়ে বলে দাবি করে র্যাব।
গতকাল বিকেলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে হোটেলের ব্যবস্থাপক মো. জাহিদের কথা হয়। তিনি জানান, ফেনীর মহিপালের মহসিন উদ্দিন ও আবদুল হালিম পরিচয় দিয়ে শনিবার সকালে ২৬১ ও ২৫৯ কক্ষে ওঠেন দুই ব্যক্তি। পরদিন র্যাব হোটেলে এসে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র-গুলিসহ তাঁদের আটক করে।
র্যাব অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, আটক চারজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সকালে পাঁচলাইশ কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সাততলা ভবনের ওই বাড়ির সপ্তম তলার ফ্ল্যাটের আলমারি থেকে পাঁচটি একে ২২ রাইফেল, একটি বিদেশি পিস্তল, একটি বন্দুক, একটি এলজি, একে ২২ এর ১০টি ম্যাগাজিন, ২ হাজার ১৫৫ রাউন্ড পয়েন্ট ২২ বোরের গুলি, ৫০১ রাউন্ড শর্টগানের গুলি উদ্ধার করা হয়। তিনি জানান, মাসুদ রানা ওরফে ফাহাদ নামের এক ব্যক্তি স্ত্রী নিয়ে ওই বাসায় থাকতেন। অভিযানের সময় তাঁরা বাসায় ছিলেন না। তালা ভেঙে র্যাব অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে। মাসুদ রানার বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেয়নি র্যাব।
গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর রোডের সপ্তম তলার ওই বাড়িতে (প্রতি তলায় এক ইউনিট) গিয়ে দেখা গেছে, দরজার তালা ভাঙা। বাইরে আরেকটি তালা দেওয়া। মাসুদ রানা সম্পর্কে ওই ভবনের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলেও তাঁরা কিছু জানাতে পারেননি।
ভবনের জেনারেটর অপারেটর মো. এমরান জানান, দারোয়ান ছুটিতে থাকায় তিন দিন ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। সকালে র্যাব বাসায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করেছে। তিনি জানান, ভবনের মালিক এখানে থাকেন না। সপ্তম তলার ভাড়াটিয়া মাসুদ রানাকে তিনি চেনেন না।