পুলিশের উদ্ধার করা সাদা রঙের মোটরসাইকেল (বাঁয়ে), আর সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া ফুটেজে দেখা যাচ্ছে নীল রঙের মোটরসাইকেল
পুলিশের উদ্ধার করা সাদা রঙের মোটরসাইকেল (বাঁয়ে), আর সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া ফুটেজে দেখা যাচ্ছে নীল রঙের মোটরসাইকেল

ছিনতাইকারীর টানে শিক্ষিকা নিহত

এখনো অন্ধকারে পুলিশ, ঘুরপাক খাচ্ছে মোটরসাইকেলের সাদা আর নীল রঙে

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীদের টানে ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই। ঘটনার ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার তিনজনের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পায়নি পুলিশ। প্রকৃত ছিনতাইকারীরাও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার তিন আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে কেউ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। তাঁদের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও বলছেন, গ্রেপ্তার আসামিদের নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। র‍্যাবও সন্দেহভাজন হিসেবেই তাঁদের গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের পাশাপাশি আরও কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে নজরদারিতে রেখেছেন তাঁরা। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেননি। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

‘এ ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। একটি অপরাধের ঘটনায় নানা ধরনের অ্যাঙ্গেল থাকে। কেউ সরাসরি অপরাধ করে। কেউ পাহারা দেয়। এ রকম নানা ধরনের যোগসূত্র থাকে। সব দিক খোলা রেখেই তদন্ত চলছে। এখনো বলার মতো কিছু পাওয়া যায়নি।’
ইবনে মিজান, উপকমিশনার, ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ

গত ২৯ আগস্ট ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে রাস্তায় পড়ে নিহত হন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন (৫৬)। চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ভোরে কল্যাণপুর বাস টার্মিনালে নেমে ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিলা পারভিনের হাতে থাকা ব্যাগ টান দেয়। এতে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নিলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এ ঘটনায় রনজিলার স্বামী আবদুল মতিন বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।

নিহত রনজিলা পারভিন

পরদিন ৩০ আগস্ট র‍্যাব রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে প্যারা পনি (২৮), তাঁর সহযোগী সেড্রিক জুলিয়ান (২৪) এবং মোটরসাইকেলটির মালিক মো. রাকিব হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের কাছ থেকে ‘ইয়ামাহা আর-১৫’ মডেলের একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানায় র‍্যাব।

র‍্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল ও ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা মোটরসাইকেল এক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছিনতাইয়ের সময় ধারণ করা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, সেটি নীল রঙের। আর র‍্যাবের উদ্ধার দেখানো যে মোটরসাইকেলের ছবি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া হয়, সেটি রুপালি ও কালো রঙের। আবার মোটরসাইকেলটি ছিনতাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে র‍্যাব যে দাবি করেছে, সেটির সত্যতা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, মামলার এজাহারে যে সময় ছিনতাইয়ের কথা বলা হয়েছে, ওই সময় মোটরসাইকেলটি তাঁদের বাসার গ্যারেজেই ছিল। সিসিটিভি ক্যামেরায় সেই ছবি স্পষ্ট দেখা গেছে। এ কথা র‍্যাব, পুলিশ ও আদালতে তিনি বারবার বলার চেষ্টা করেছেন। ফুটেজ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেননি। কোনো তথ্যপ্রমাণই আমলে নেওয়া হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঘটনার পর প্রকাশ হওয়া সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাওয়া ব্যক্তিদের চেহারা স্পষ্ট নয়। তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। মোটরসাইকেলের রঙের বিষয়টির মীমাংসা এখনো হয়নি।

মামলাটি তদন্ত করছেন শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জড়িত থাকার সঠিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। কিছু তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।’

গ্রেপ্তারের স্থানের তথ্যেও গরমিল

মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, ৩০ আগস্ট বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে তেজগাঁও থানার পূর্ব তেজতুরীপাড়া গাজী আব্বাসের বাসার সামনে পাকা রাস্তার ওপর থেকে আসামি পনি ওরফে প্যারা পনি ওরফে পনি গাজী (২৮) ও সেড্রিক জুলিয়ানকে (২৪) ধরা হয়। তাঁদের কাছ থেকে একটি করে অ্যান্ড্রয়েড ফোন এবং নগদ পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

তবে ২ সেপ্টেম্বর ওই এলাকা ঘুরে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। পনিকে গ্রেপ্তার করা হয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের অপর পাশের প্রোপার্টি-রো ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে। ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী খোরশেদ আলম (৫৫) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২৯ তারিখ দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে র‌্যাব পরিচয়ে কয়েকজন পনিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ধরে নিয়ে যান। তিনিই সে সময় ভবনটির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। ওই র‍্যাব কর্মকর্তাদের পনির বাসায় তিনিই নিয়ে যান।

এ ছাড়া একই এলাকার চৌরঙ্গী মোড়ের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন সেড্রিক জুলিয়ান। সেদিন ভোরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বাসার নিচের কয়েকজন দোকানি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, মামলার এজাহারে যে সময় ছিনতাইয়ের কথা বলা হয়েছে, ওই সময় মোটরসাইকেলটি তাঁদের বাসার গ্যারেজেই ছিল। সিসিটিভি ক্যামেরায় সেই ছবি স্পষ্ট দেখা গেছে। এ কথা র‍্যাব, পুলিশ ও আদালতে তিনি বারবার বলার চেষ্টা করেছেন। ফুটেজ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেননি। কোনো তথ্যপ্রমাণই আমলে নেওয়া হয়নি।

চৌরঙ্গী মোড়ের এক মুদিদোকানি প্রথম আলোকে বলেন, সেড্রিককে তাঁর বাসা থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই দিন সকালে দোকানে এসে তিনি গ্রেপ্তারের কথা জানতে পারেন। গ্রেপ্তারের পরপরই বাসাটির নিচে স্থানীয় বাসিন্দাদের জটলা ছিল। তাঁদের কাছ থেকেই গ্রেপ্তারের কথা শোনেন তিনি।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ‘এ ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। একটি অপরাধের ঘটনায় নানা ধরনের অ্যাঙ্গেল থাকে। কেউ সরাসরি অপরাধ করে, কেউ পাহারা দেয়। এ রকম নানা ধরনের যোগসূত্র থাকে। সব দিক খোলা রেখেই তদন্ত চলছে। এখনো বলার মতো কিছু পাওয়া যায়নি।’

আসামিরা কারাগারে

সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষিকার মৃত্যুর ঘটনায় আটক দুজনকে ৩০ আগস্ট সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে আসে র‌্যাব

গ্রেপ্তার আসামিদের পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে ৫ সেপ্টেম্বর আদালতে তোলা হয়। আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আসামিদের কারাগারে আটকে রাখার আদেশ দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেন এ আদেশ দেন।

জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ না থাকলেও কেন আটকে রাখার আবেদন করা হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা শাহিন বলেন, আদালতকে আসামিদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য জানানো হচ্ছে। কারাগারে আটকে রাখার যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। আদালত তাঁদের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়েই আসামিদের কারাগারে আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

অগ্রগতি জানেন না বাদী

মামলার বাদী আবদুল মতিন এজাহারে উল্লেখ করেন, রনজিলা পারভিনের হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগে দুটি মুঠোফোন ছিল। একটি স্মার্টফোন, যার আনুমানিক মূল্য ২৫ হাজার টাকা। আরেকটি বাটন ফোন, যার মূল্য মাত্র দুই হাজার টাকা। এ ছাড়া ব্যাগে নগদ ১০ হাজার টাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি ফটোকপি ছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছিনতাইয়ে খোয়া যাওয়া মালামাল এখনো উদ্ধার করতে পারেনি তারা। তারা উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

মামলার বাদী আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধারের কোনো তথ্য জানেন না তিনি। পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলার অগ্রগতি তাঁকে জানানো হয়নি। আবার তিনিও মামলার খোঁজ নিতে পারেননি। তিনি যতটুকু জেনেছেন, মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছেন।