
সকালের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছিল শেরপুরের শ্রীবরদীর পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা বড় একটি তালাবদ্ধ প্লেনশিটের ট্রাংক প্রথমে কারও নজরে পড়েনি। পরে স্থানীয় কয়েকজন কাছে গিয়ে দেখেন, ট্রাংকটি অস্বাভাবিক ভারী, কিন্তু আশপাশে এর মালিকের কোনো চিহ্ন নেই। কৌতূহল থেকে শুরু হয় আলোচনা। তারপর খবর যায় পুলিশে।
পুলিশ এসে তালা ভাঙতেই বেরিয়ে আসে তোশকে মোড়ানো এক নারীর অর্ধগলিত লাশ। হাত-পা বাঁধা, মুখ স্থানীয় বাসিন্দাদের অচেনা। কে এই নারী, কীভাবে তাঁর লাশ এখানে এল—এসব প্রশ্নের অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রথমে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করে পিবিআই। জানা যায়, তাঁর নাম ডলি আক্তার (৩৫)। তাঁর বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায়। তখনো খুনের কারণ জানা যায়নি।
কয়েক দিন পর তদন্তকারীদের হাতে আসে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার একটি ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, সকালে একটি নীল রঙের পিকআপ ভ্যান ঢুকছে এলাকায়, আর মাত্র ১০ মিনিট পর ফিরে যাচ্ছে। তবে ফেরার সময় গাড়িতে নেই ট্রাংকটি। সেই নীল পিকআপই শেষ পর্যন্ত খুলে দেয় হত্যার রহস্য।
১ এপ্রিল সকালে ট্রাংকের ভেতর থেকে ডলি আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ শনাক্ত হওয়ার পর ওই দিনই ডলি আক্তারের ভাই শফিকুল ইসলাম শ্রীবরদী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। সেই মামলা তদন্ত করছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের জামালপুর ইউনিটের ইনচার্জ পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা নীল রঙের পিকআপটি শনাক্ত করার পর হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
১০ মিনিটের ভিডিও
হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর ভিডিও সংগ্রহ করে পিবিআই। তদন্তকারী কর্মকর্তারা একে একে তা মিলিয়ে দেখতে থাকেন। ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরের একটি ক্যামেরার ভিডিওতে।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ১ এপ্রিল সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে নীল রঙের একটি পিকআপ ভ্যান বড় একটি ট্রাংক নিয়ে এলাকায় ঢুকছে। এর ঠিক ১০ মিনিট পর সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে একই গাড়ি আবার বেরিয়ে যায়। কিন্তু এবার গাড়িতে আর ট্রাংকটি নেই।
পিবিআই জানিয়েছে, এই নীল পিকআপ ভ্যানের সূত্র ধরে ৩ এপ্রিল শ্রীবরদীর ভেলুয়া এলাকা থেকে গাড়িচালক আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ভোরে শেরপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাতশালা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে নিয়ামুর নাহিদ (২৬) ও তাঁর স্ত্রী রিক্তা মনিকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়।
ফুটেজে দেখা যায়, ১ এপ্রিল সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে নীল রঙের একটি পিকআপ ভ্যান বড় একটি ট্রাংক নিয়ে এলাকায় ঢুকছে। এর ঠিক ১০ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে একই গাড়ি আবার বেরিয়ে যায়। কিন্তু এবার গাড়িতে আর ট্রাংকটি নেই। এই ১০ মিনিটের ফুটেজই পরে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
জিজ্ঞাসাবাদে নিয়ামুর নাহিদ স্বীকার করেন, গাজীপুরের শ্রীপুরে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ডলি আক্তারকে হত্যা করা হয়। এরপর আশরাফ আলীর মাধ্যমে লাশ ট্রাংকে ভরে দেড় শ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদীর পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে ফেলে দেওয়া হয়।
পিবিআইয়ের কর্মকর্তা পংকজ দত্ত বলেন, পিকআপটি শনাক্ত করার পর দেখা যায়, গাড়ির নিবন্ধন একটি গাড়ি বিক্রির প্রতিষ্ঠানের নামে। সেখানে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, এক ব্যক্তি ওই গাড়ি কিস্তিতে তাদের কাছ থেকে কিনেছেন। তবে কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় মালিকানা হস্তান্তর করা হয়নি। ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ক্রেতাকে শনাক্ত করা হয়। সেই ক্রেতা নিজেই গাড়িটির চালক ছিলেন। পরে তাঁকে গ্রেপ্তারের পর হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
কথা-কাটাকাটির জেরে হত্যা
নিহত ডলি আক্তারের ভাই শফিকুল ইসলাম পিবিআইকে জানিয়েছেন, ডলি তাঁর স্বামী বিল্লালকে নিয়ে ময়মনসিংহের ভালুকার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী আইডিয়াল মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্থানীয় একটি সোয়েটার কারখানায় কাজ করতেন ডলি। তাঁর দুই ভাইও একই এলাকায় কাজ করতেন এবং কাছাকাছি বাসায় থাকতেন।
গত ৩০ মার্চ থেকে ডলির মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেলে তিনিসহ স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে শ্রীবরদী থানায় গিয়ে তিনি বোনের লাশ শনাক্ত করেন বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন শফিকুল ইসলাম।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার নিয়ামুর নাহিদ ও তাঁর স্ত্রী রিক্তা মনি গাজীপুরের শ্রীপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। দুজনই একটি টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করতেন। পরিচয়ের সূত্রে ৩০ মার্চ রাতে ডলি আক্তারকে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন নাহিদ। সে সময় তাঁর স্ত্রী রিক্তা মনি বাসায় ছিলেন না।
তদন্তে জানা গেছে, বাসায় যাওয়ার পর ডলি আক্তারের সঙ্গে নাহিদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ডলি চিৎকার করলে বিষয়টি বাইরে জানাজানি হয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় নাহিদ তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন। এতে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা নীল রঙের পিকআপটি শনাক্ত করার পর হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে।পংকজ দত্ত, ইউনিটের ইনচার্জ ও পুলিশ সুপার, পিবিআই জামালপুর
স্ত্রীকে জানিয়ে লাশ গোপনের পরিকল্পনা
পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রী রিক্তা মনিকে বাসায় নিয়ে আসার পথে ডলিকে হত্যা করার কথা জানান নাহিদ। এরপর দুজন মিলে পরিকল্পনা করেন, কীভাবে ঘটনাটি গোপন করা যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্লেনশিটের একটি বড় ট্রাংক কেনা হয়। ডলি আক্তারের হাত-পা বেঁধে তোশকে পেঁচিয়ে লাশ ট্রাংকে ভরা হয়।
পরদিন ৩১ মার্চ মধ্যরাতে ওই নীল রঙের পিকআপ ভ্যানটি ভাড়া করেন তাঁরা। পিকআপে করে ট্রাংকটি নিয়ে রওনা হন শেরপুরের শ্রীবরদীর পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ের দিকে। পরে ১ এপ্রিল সকালে ট্রাংকটি সেখানে ফেলে রেখে আবার গাজীপুরে ফিরে যান নাহিদ।