রাতের খাবার খেয়ে অটোরিকশা রাখার ওয়ার্কশপে ঘুমাতে গিয়েছিলেন ১৯ বছরের রাহুল। পরদিন আর বাড়ি ফেরেননি। বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল তাঁর মুঠোফোন, খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না অটোরিকশাটির। দুই দিন পর ওয়ার্কশপের পাশে ভুট্টা খেতের আইলের ঝোঁপ থেকে রাহুলের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর কেটে যায় দুই বছরের বেশি সময়। অবশেষে সেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মো. সবুজ মিয়া (২৮) ও মো. লালন মোল্লা (৪৩) নামে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই জানায়, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত এবং গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে নিহত রাহুল ও আসামিরা পূর্বপরিচিত ছিলেন। ইয়াবা কেনাবেচা ও সেবনের সূত্র ধরেই তাঁদের মধ্যে পরিচয়। পরে ইয়াবা বিক্রির তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার আশঙ্কায় রাহুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁকে ডেকে নিয়ে প্রথমে ইয়াবা সেবন করানো হয়। পরে লোহার অ্যাঙ্গেল, ব্লেড ও অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়ে আঘাত করে এবং শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়। লাশ গরুর খামারে দুই দিন রেখে অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেওয়া হয়।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, রাহুলদের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার চক সিংহড়া এলাকায়। তিনি অটোরিকশা চালাতেন। রাহুল তাঁর ভাড়া করা অটোরিকশাটি নবাবগঞ্জ থানার চক সিংহড়া এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপে রাখতেন। রাতে ওই ওয়ার্কশপেই ঘুমাতেন তিনি। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে রাহুল নিজের বাসা থেকে রাতের খাবার খেয়ে ওয়ার্কশপে ঘুমানোর জন্য যান। পরদিন বাড়ি না ফেরায় তাঁর বাবা ওয়ার্কশপে গিয়ে খোঁজ করেন। কিন্তু সেখানে রাহুলকে পাওয়া যায়নি। ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ওই ওয়ার্কশপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভুট্টা ঘাসের জমির আইলের ঝোঁপে তাঁর লাশ পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় ওই দিন নিহতের বাবা মো. আবদুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে নবাবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে মামলাটি থানা-পুলিশ তদন্ত করছিল। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআইয়ের এসআই মো. আব্দুর রহিম মামলাটি তদন্ত করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা এ হত্যাকাণ্ডে গত মার্চে প্রথমে মো. সমেজ (৩২) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার পাতিলঝাপ এলাকায়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকা থেকে আসামি সবুজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। সবুজ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সবুজ মিয়ার দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন-খবির ওরফে গোবিন্দ (২৮), মো. হাবিব ওরফে সজল (৩৬) এবং মো. লালন মোল্লা (৪৩)। এদের মধ্যে লালন মোল্লাও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ আজ উত্তরায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা রাহুলের পূর্বপরিচিত। তাদের মধ্যে লালন মোল্লা ইয়াবার কারবার করতেন। রাহুল ও অন্য আসামিরা তাঁর কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন এবং একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতেন। লালন সবুজের কাছে জানতে পারেন, তাঁর ইয়াবা বিক্রির তথ্য রাহুল বাইরে বিভিন্ন জায়গায় জানিয়ে দেবেন বলে সবুজকে বলেছেন। এরপর আসামিরা রাহুলকে হত্যা করে তাঁর অটোরিকশা ছিনিয়ে নিয়ে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেন।
পিবিআই কর্মকর্তা মোর্শেদ বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে লালন আসামি সবুজকে দিয়ে রাহুলকে তাঁর অটোরিকশাসহ নবাবগঞ্জ এলাকার তমসেল মাদবরের খোলা মাঠে ডেকে নিয়ে যান। রাহুল সেখানে যাওয়ার পর দেখা যায়, লালন, সজল, সমেজ ও গোবিন্দ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা প্রথমে রাহুলকে ইয়াবা সেবন করান। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে লালন লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে রাহুলের মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে তাঁর মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। এরপর রাহুলের কান ও মুখে ব্লেড দিয়ে আঘাত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, রাহুলের অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়েও তাঁর মুখে আঘাত করা হয়। পরে শ্বাসরোধ করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর লাশ অটোরিকশায় বসিয়ে আসামিরা সজলের গরুর খামারে নিয়ে যান। সেখানে মৃতদেহ দুই দিন রাখা হয়। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার পর রাহুলের মরদেহ ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপের পাশে ফেলে রাখা হয়। পরে সেখান থেকেই অর্ধগলিত অবস্থায় রাহুলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।