মুক্তিপণের জন্য দেড় মাস আটকে রাখা হয়েছিল আট বছর বয়সী শিশু মাহফুজকে। কিন্তু মুক্তিপণ না পাওয়ায় তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের সেই শিশুহত্যা মামলায় ১৪ বছর পর তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
রায়ে এ ঘটনাকে ‘অমানবিকতা ও পাশবিকতার চরম উদাহরণ’ উল্লেখ করে বিচারক বলেন, একটুকরা তাজা প্রাণকে কিছু কাগজের টাকার দর–কষাকষির পণ্যে পরিণত করা হয়েছিল।
৭ জুলাই ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪–এর বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন এ হত্যা মামলার রায় দেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, অপহরণের পর প্রায় ৪৫ দিন শিশুটিকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে গোপনে আটকে রাখা হয়। দাবি অনুযায়ী টাকা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন জামাল শেখ, শামীম শেখ ও রঞ্জু শেখ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন মাহমুদা খানম উষা ও বিল্লাল শেখ। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত দুজনকে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, ‘একটুকরা তাজা প্রাণকে তাঁরা রূপান্তর করলেন স্রেফ কিছু কাগজের টাকার দর-কষাকষির পণ্যে। দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস ধরে এক অন্ধকার, অচেনা বন্দিশালায় অবরুদ্ধ রেখে ক্ষুধা আর আতঙ্কে নীল হয়ে যাওয়া শিশুটির ওপর চালানো হয়েছিল অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। মুক্তিপণের লোভ পূরণ না হওয়ায় মানুষের চামড়া পরিহিত সেই হিংস্র হায়েনারা মেতে উঠেছিল রক্ত হিম করা এক হত্যাযজ্ঞে।’
বিচারক আরও বলেন, ‘এটি শুধু একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের আইনি খতিয়ান নয়, মানুষের রূপধারী কিছু অপরাধীর হিংস্রতার বলি হওয়া এক নিষ্পাপ শিশুর অকালে ঝরে যাওয়ার করুণ ইতিহাস।’
একটি অসাধারণ জীবনের সব সম্ভাবনা, সব আলো আর নিষ্পাপ শৈশবকে শ্বাসরোধে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রাণহীন দেহটি ফেলে রাখা হয়েছিল এমনভাবে, যেন সে কোনো মানুষের সন্তান নয়, স্রেফ একদলা আবর্জনা।ফারজানা ইয়াসমিন, বিচারক, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪
মামলার নথি ও আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাদীপক্ষের সঙ্গে আসামি বিল্লাল শেখের জমিজমা–সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। এর জের ধরে প্রতিশোধ নেওয়া এবং মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে ২০১২ সালের ২ জুলাই গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া বাজারে একটি গোপন বৈঠকে শিশুটিকে অপহরণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন দিন পর ৫ জুলাই পবিত্র শবে বরাতের রাতে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রাম থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলে তুলে অপহরণ করা হয় আট বছরের মাহফুজকে।
অপহরণের পর পরিবারের কাছে বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে প্রথমে ৩ লাখ, পরে ৫০ লাখ এবং সর্বশেষ ৭০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন জামাল শেখ, শামীম শেখ ও রঞ্জু শেখ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন মাহমুদা খানম উষা ও বিল্লাল শেখ। আসামিরা জামিন নিয়ে এখন পলাতক। তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, অপহরণের পর প্রায় ৪৫ দিন শিশুটিকে আটকে রাখার সময় স্থান বদলও করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওই বছরের ১৭ আগস্ট তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আসামি মাহমুদা খানম উষার বাড়িতে।
এরপর ২০ আগস্ট দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ওই বাড়িতেই শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
কীভাবে শিশুটির পরনের প্যান্ট তারই গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল; আসামিদের কে, কীভাবে হত্যাকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছিলেন; রায়ে তা সবিস্তার তুলে ধরেন বিচারক।
হত্যার পর মরদেহ বাড়ির পাশের একটি মেহগনিবাগানে ফেলে রাখা হয়।
বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ‘একটি অসাধারণ জীবনের সব সম্ভাবনা, সব আলো আর নিষ্পাপ শৈশবকে শ্বাসরোধে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রাণহীন দেহটি ফেলে রাখা হয়েছিল এমনভাবে, যেন সে কোনো মানুষের সন্তান নয়, স্রেফ একদলা আবর্জনা।’
আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। আওয়ামী লীগের সময় এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে রাজি হতেন না সাক্ষীরা। ফলে মামলার রায় পর্যায়ে আসতে দেরি হয়েছে।গিয়াস উদ্দিন, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, শিশুটি হত্যার পরদিন, অর্থাৎ ২০১২ সালের ২১ আগস্ট তার মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ২০ নভেম্বর পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দেয়। ২০১৩ সালে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪–এ স্থানান্তর করা হয়। ২০১৪ সালে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে শুরু হয় বিচার।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নিজাম শিকদারের তদন্ত এবং আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপিত হয়।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, ট্রাইব্যুনালের পিপি গিয়াস উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষে ২৩ জন এবং আসামিপক্ষে আটজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর আগে একই ঘটনায় জড়িত দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে পৃথক বিচারে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত।
পিপি গিয়াস উদ্দীন জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই জামিনে ছিলেন এবং নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতেন। তবে রায়ের দিন তাঁরা আদালতে উপস্থিত হননি।
পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।
বিচারে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়ে গিয়াস উদ্দীন বলেন, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। আওয়ামী লীগের সময়ে এই মামলায় সাক্ষ্য দিতে রাজি হতেন না সাক্ষীরা। ফলে মামলার রায় পর্যায়ে আসতে দেরি হয়েছে। ৫ আগস্টের পর মামলার অগ্রগতি বাড়ে।