নিহত নারগিস বেগম, আসামি মো. রবিন, নিহত মো. শামীম
নিহত নারগিস বেগম, আসামি মো. রবিন, নিহত মো. শামীম

ধামরাইয়ে ৩ খুন: এক খটকায় ঘোরে তদন্তের মোড়

এক বছর আগে ঢাকার ধামরাইয়ে নারগিস বেগম ও তাঁর দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের পর খাবারে বিষক্রিয়ার কথাই আসছিল। সেই কারণে মামলাটি হয়েছিল অপমৃত্যুর। কিন্তু একটি তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তার মনে লাগে খটকা। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জট খোলে এই হত্যাকাণ্ডের। এখন আসামি হয়ে বিচারের মুখোমুখি ওই নারীর জামাতা মো. রবিন।

রবিন (২২) এখন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তিনি বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গত ১৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপপরিদর্শক (এসআই) মনজুর রহমান ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। মামলাটি এখন বিচারের জন্য ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘরজামাই রবিন শ্বশুরবাড়ির ডেকোরেটের ব্যবসা দেখভাল করতেন। শাশুড়ির সেই ব্যবসাটি বিক্রি করে দেওয়ায় ক্ষোভ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে এই মামলার কোনো ক্লু ছিল না। রবিন খুবই সুকৌশলে হ্যান্ডেল করছিলেন। মূলত একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পুরো রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়।

যে তথ্যে খটকা

২০২৫ সালের ২ জুন দিবাগত রাতে ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামে নিজেদের ঘর থেকে মৃত রাজা মিয়ার স্ত্রী নারগিস (৪২) এবং তাঁর দুই ছেলে মো. শামীম (১৭) ও সোলাইমানের (৮) লাশ উদ্ধার করা হয়।

নারগিসের মেয়ে নাসরিন আক্তার তখন জানিয়েছিলেন, ঘরের ভেতরে বিছানার ওপর কাঁথা জড়ানো অবস্থায় পড়ে ছিল তাঁর মা ও ভাইদের মরদেহ। নারগিসের পরিবার থেকে তখন ধারণা দেওয়া হয়েছিল, খাবারে বিষক্রিয়া এই মৃত্যুর কারণ।

আবার এই অভিযোগ তোলা হয়েছিল, সম্পত্তির বিরোধ থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন খাবারে বিষ মিশিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নাসরিনের স্বামী রবিনও তখন এই দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রাতে ডিম-ভাত কিংবা জুসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে তিনজনকে মারা হয়েছে।

পুলিশ খাবারে বিষক্রিয়ার সন্দেহে সেদিন অপমৃত্যুর মামলা নিয়েছিল। দুই দিন পর ৪ জুন মামলার তদন্তভার নেন ঢাকা জেলা পিবিআই কর্মকর্তা মনজুর রহমান।

২০২৫ সালের ২ জুন ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামে ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় নারগিস বেগম ও তাঁর দুই ছেলের মরদেহ। তখন খাবারে বিষক্রিয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে তদন্তে উদ্‌ঘাটিত হয়, শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল তিনজনকে।

তদন্ত শুরু করে বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মনজুর রহমান জানতে পারেন, সেদিন রবিন ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানও নারগিসের বাড়িতেই রাতের খাবার খেয়েছিলেন। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন আসে, একই খাবার খেয়ে কেউ মারা গেলেন, আবার কেউ বেঁচে থাকলেন কীভাবে?

মনজুর রহমান বলেন, ‘শুরু থেকেই বিষক্রিয়ার তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। মোবাইল ফোনের অবস্থান, ঘটনাস্থলের আলামত, জব্দ করা মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর রবিনকে সন্দেহের তালিকায় আনা হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।’

অভিযোগপত্রে বলা হয়, সন্ধ্যা রাতে খাওয়াদাওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন রবিন। কিন্তু তাঁর মুঠোফোনের অবস্থান বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এরপর রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের আবার শ্বশুরবাড়িতে যান তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে শ্বশুরবাড়ি ছাড়ার পর গভীর রাতে রবিনের আবার ঘটনাস্থলে উপস্থিতির তথ্যই তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

শুরুতে এই মামলার কোনো ক্লু ছিল না। রবিন খুবই সুকৌশলে হ্যান্ডেল করছিলেন। মূলত একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পুরো রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়।
মনজুর রহমান, উপপরিদর্শক, পিবিআই

ক্ষোভ থেকে হত্যা

রবিন ছিলেন ঘরজামাই। শ্বশুর রাজা মিয়া মারা যাওয়ার পর পরিবারের ডেকোরেটর ব্যবসা তিনি দেখাশোনা করতেন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, রবিন কোনো হিসাব শাশুড়িকে দিতেন না। তাই শাশুড়ি তাঁকে না জানিয়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ব্যবসাটি বিক্রি করে দেন। এ ঘটনায় রবিন খুব ক্ষুব্ধ হন এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে চলে যান এবং দীর্ঘদিন যোগাযোগ রাখেননি। বেশ কিছুদিন পরই সেদিন শাশুড়ির দাওয়াতে ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন রবিন।

ঢাকার ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামে ২০২৫ সালের ৩ জুন ঘরের ভেতর থেকে মা ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের পর ভিড় জমিয়েছিল গ্রামের মানুষ

অভিযোগপত্রে বলা হয়, সেদিন ব্যবসা বিক্রির টাকা নিয়ে রবিনের স্ত্রী নাসরিনের সঙ্গে তাঁর মায়ের কথা–কাটাকাটি হয়। এই ঘটনায় শাশুড়ির ওপর রবিনের ক্ষোভ আরও বাড়ে। রাতে খেয়ে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও মধ্যরাতে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফেরেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রবিন বলেন, তখনই তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাঝেমধ্যে ব্যবসা নিয়ে তাঁর সঙ্গে বড় শ্যালক শামীমের ঝগড়া হতো। তাই শ্বশুরবাড়ির সবার ওপরই তাঁর ক্ষোভ ছিল।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘরজামাই রবিন শ্বশুরবাড়ির ডেকোরেটর ব্যবসা দেখাশোনা করছিলেন। তা নিয়ে বিরোধ থেকে একপর্যায়ে শাশুড়ি ব্যবসা বিক্রি করে দেন। তার প্রতিশোধ নিতেই শাশুড়ি ও শ্যালকদের হত্যা করেন রবিন।

জবানবন্দিতে হত্যার বর্ণনা

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রবিন বলেন, গভীর রাতে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রথমে বড় শ্যালক শামীমের মুখে বালিশ চেপে ধরে তাঁকে হত্যা করেন তিনি। পরে একই কায়দায় শাশুড়ি নারগিস ও সোলাইমানকে হত্যা করেন। এরপর তিনজনের মরদেহ একই খাটে কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখেন, যাতে কারও দেখে মনে হয় যেন তাঁরা ঘুমিয়ে আছেন। তিনজনকে হত্যার পর ভোর চারটার দিকে তিনি বেরিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যান।

রবিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি বালিশ ও মুঠোফোন উদ্ধারের কথা জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

রবিনের গ্রাম থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব বেশি নয়; মাঝে দুটি গ্রাম। তাই সহজেই তাঁর যাতায়াত করার সুযোগ ছিল।

লাশ উদ্ধারের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন রবিন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিজেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিষক্রিয়ার গল্প বলতে থাকেন। শ্বশুরের সৎভাইকেও দোষারোপ করেন।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উদ্দেশ্য ছিল তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং নিজেকে সন্দেহের বাইরে রাখা।

আমি ওই খুনির ফাঁসি চাই। আমার বোন ওই খুনিরে খুব ভালোবাসত। কিন্তু ওই (রবিন) আমার বোন-ভাগনেরে খুন করে ফেলল।
আবদুর রশীদ, মামলার বাদী

স্ত্রী এখনো সন্দিহান

স্বামী রবিনই মা-ভাইদের হত্যা করেছেন কি না, তা নিয়ে এখনো সন্দিহান নাসরিন আক্তার।

নাসরিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রবিন মেরেছে কি না, আমি জানি না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছি। সে আমাকে বলেছে যে সে আমার মা ও ভাইকে মারেনি। রবিন মেরেছে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। সে (রবিন) বলেছে, পুলিশের ভয়ে সে জবানবন্দি দিয়েছে আদালতে।’

তবে ব্যবসা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে মা ও ভাইয়ের দ্বন্দ্ব ছিল বলে স্বীকার করেন নাসরিন। তিনি বলেন, এ কারণেই তাঁর মা ডেকোরেটরের ব্যবসা বন্ধ করে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

নাসরিনের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান বলেন, প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে করেছিলেন নাসরিন ও রবিন। নাসরিন শুরু থেকেই রবিনকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তবে তদন্ত ভিন্ন তথ্যই দিচ্ছে।

মামলাটি করেছিলেন নিহত নারগিসের ভাই আবদুর রশীদ। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ওই খুনির ফাঁসি চাই। আমার বোন ওই খুনিরে খুব ভালোবাসত। কিন্তু ওই (রবিন) আমার বোন-ভাগনেরে খুন করে ফেলল।’

এই মামলার একজন সাক্ষী শাহিনুর রহমান দোষীর শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, ‘একসঙ্গে একই পরিবারের তিনজন খুন হওয়ার ঘটনা এলাকায় ভীতি ছড়িয়ে পড়ে সেই সময়। দোষীর শাস্তি হওয়া দরকার।’

তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান বলেন, ১৪ জনের সাক্ষ্য এবং তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১৪ জানুয়ারি তিনি আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে রবিনকে একমাত্র আসামি করা হয়।