লাল চাঁদ
লাল চাঁদ

পুরান ঢাকায় লাল চাঁদ হত্যা: বানান ঠিক হয়নি ৫ মাসেও, আটকে আছে অভিযোগপত্র

  • আদালতের নির্দেশের পরও চারবার পিছিয়েছে সংশোধিত অভিযোগপত্র জমার তারিখ।

  • পরিবার বলছে, ‘অদৃশ্য শক্তির’ প্রভাবে বিলম্ব হচ্ছে বিচারপ্রক্রিয়ায়।

  • পলাতক আসামিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ।

পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) সামনে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ (৩৯) হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তদন্ত শেষে গত বছরের ডিসেম্বরে আদালতে ওই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। তবে অভিযোগপত্রের নথি পর্যালোচনা করে তাতে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকার কথা জানান আদালত। ভুলগুলো সংশোধন করে আবার অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশের পাঁচ মাস পেরোলেও ভুল সংশোধন করা হয়নি।

গত বছরের ৯ জুলাই মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়। হাসপাতালের কাছেই রজনী বোস লেনে ভাঙারির ব্যবসা করতেন তিনি। পিটিয়ে, ইট–পাথরের খণ্ড দিয়ে আঘাত করে তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁকে বিবস্ত্র করা হয়। তাঁর শরীরের ওপর উঠে হত্যাকারীদের লাফাতে দেখা যায় সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজে। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পরদিন ১০ জুলাই নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়।

তদন্ত শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান। অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে কিছু বানান ভুল সংশোধনের নির্দেশ দেন আদালত। এর মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান শাহবাগ থানায় বদলি হয়ে যান। এরপর মামলাটির দায়িত্ব পান কোতোয়ালি থানার নতুন ওসি শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ।

অভিযোগপত্রে কিছু শব্দের বানান সংশোধন করতে বলেন আদালত। এ জন্য চারবার সময় চেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। থমকে আছে বিচারকাজ।

লাল চাঁদের পরিবার বলছে, ভুলগুলো বড় কিছু নয়। কিছু শব্দে আ–কার, ই–কার সংশোধন করতে বলা হয়। কিন্তু এর পর থেকে একের পর এক শুনানির তারিখ চাচ্ছে পুলিশ। অদৃশ্য শক্তির প্রভাবেই এমনটা হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।

তারিখ পিছিয়েছে চারবার

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে সংশোধনী জমা দেওয়ার চারবার তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ ৫ মে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা থাকলেও এক সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত তা মঞ্জুর করেন।

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি ফয়সাল আহমেদ বলেন, অভিযোগপত্রে কিছু সংশোধনী ছিল। আদালতের নির্দেশেই তা সংশোধন হচ্ছে। দ্রুতই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।

হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ২১ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন ওসি মনিরুজ্জামান। ভাঙারির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করাসহ এলাকার আধিপত্য নিয়ে আসামি মাহমুদ হাসান মহিন ও সরোয়ার হোসেন টিটুর সঙ্গে বিরোধের কারণেই লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় ১০ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

তাড়াহুড়ো করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ায় কিছু ভুল (ক্ল্যারিক্যাল মিসটেক) থেকে যায় উল্লেখ করে ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি শাহবাগ থানায় চলে এসেছেন। তারপর কেন পাঁচ মাস সময় লাগল, তা বলতে পারবেন না।

হত্যায় নেতৃত্ব দেন টিটু-মহিন

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মঙ্গল মিয়া ওরফে মনির হোসেন, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব ব্যাপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, মো. পারভেজ, সাগর, রুমান ব্যাপারী, আবির হোসেন, মো. জহির ওরফে জলিল, মো. ইমরান, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার, জিয়াউদ্দিন রাজিব। এই ২১ জনের মধ্যে ৮ জন আসামি পলাতক। তাঁরা হলেন সারোয়ার হোসেন টিটু, মো. জহির ওরফে জলিল, মো. ইমরান, মো. শারাফাত ওরফে শফিউল, মো. জিয়াউদ্দিন রাজিব, হোসেন চৌকিদার, মনির ওরফে লম্বা মনির ও অপু দাস।

ভাঙারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে মহিন চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, তারেক রহমান রবিন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সরোয়ার হোসেন টিটু চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক সদস্য, অপু দাস চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। অপু দাসকে ঘটনার পরপরই আজীবন বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনার আগে থেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল।

ঘটনায় জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় রাজিব ব্যাপারী, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, সিরাজুল ইসলাম, হিম্মত আলী, আনিসুর রহমান হাওলাদার, মিজান, মো. নাঈম ও রিয়াদকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রজব আলী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহকারী জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবাহ করিম লাকী। আর কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু হলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী। এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে গত বছরের ১১ জুলাই তাঁদেরকে এসব সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

হত্যায় আসামিদের ভূমিকা তুলে ধরে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সোহাগ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্ব দেন আসামি মহিন ও সারোয়ার। তাঁরা ঘটনাস্থলে থেকে সার্বক্ষণিক নির্দেশ দেন। হত্যার পর দুজনেই মৃতদেহের চারপাশে ঘুরে ঘুরে অনুসারীদের নিয়ে স্লোগান দেন। আর মনির ওরফে ছোট মনির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সোহাগের বুকের ওপর লাফিয়ে দুই হাত ওপরে তুলে উল্লাস করেন।

ন্যায়বিচার নিয়ে সন্দেহ পরিবারের

পরিবারের অভিযোগ, পালিয়ে থাকা আসামিরা নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছেন। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় রয়েছেন। এমনকি মাঝেমধ্যে রজনী বোস লেনেও যাওয়া–আসা করছেন। মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

মামলার বাদী মঞ্জুয়ারা বেগমের মেয়ে বীথি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারোয়ার হোসেন টিটু মেসেঞ্জারে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। হুমকিতে তাঁরা বলেছেন, বাড়াবাড়ি করিস না। একটা হত্যা আর একাধিক হত্যার সাজা কিন্তু একই।’

সামান্য বানান ঠিক করতেই পাঁচ মাস পেরিয়ে গেল উল্লেখ করে মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘কেন এমন হচ্ছে জানি না। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে এখন সন্দেহ প্রকাশ করছি।’