নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের শর্টগান গত সোমবার উদ্ধার করা হয়
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের শর্টগান গত সোমবার উদ্ধার করা হয়

লুট হওয়া অস্ত্র ও পলাতক বন্দী নিয়ে এখনো উদ্বেগ

  • লুট হওয়া অস্ত্রের একাংশ অপরাধীদের হাতে, ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন অপরাধে।

  • অস্ত্র বিক্রিতে পুলিশ সদস্যের জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

  • ধরা না পড়া বন্দীদের মধ্যে রয়েছেন ফাঁসির আসামি ও চিহ্নিত জঙ্গি।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সিংগারপুরে মাছ ধরার সময় জেলের জালে উঠে আসে একটি শটগান। ঘটনাটি গত সোমবারের। পরে রেজিস্টার যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, আগ্নেয়াস্ত্রটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি।

এ ঘটনা আবারও গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদের একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক শ বন্দীকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি, সেই বিষয়ও।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের হাতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি লুট হওয়া অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে পুলিশের সদস্যের জড়িত থাকার তথ্যও সামনে এসেছে। অন্যদিকে কারাগার থেকে পালানো বন্দীদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও জঙ্গি। এ পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে এক মাসের মধ্যে শুরু হয় যৌথ অভিযান। ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ অভিযানে চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আর গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৯টি। অর্থাৎ গত ৫ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি।
পুলিশের লুট হওয়া উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র-গুলি

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি, বক্সসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট-স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। গোলাবারুদ লুট হয় ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদের মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, এসএমজি (স্মল মেশিনগান), এলএমজি (লাইট মেশিনগান), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার, কাঁদানে গ্যাসের শেল, কাঁদানে গ্যাসের স্প্রে, সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, ব্যাং গ্রেনেড, হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে ও বিভিন্ন বোরের গুলি।

অবশ্য লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে এক মাসের মধ্যেই শুরু হয় যৌথ অভিযান। ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ অভিযানে চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আর গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৯টি, অর্থাৎ গত ৫ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি।

ধরা না পড়া বন্দীদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও ৯ জন জঙ্গি। আর লুট হওয়া কিছু চায়নিজ রাইফেল ও শটগান এখনো উদ্ধার হয়নি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক

অন্যদিকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে-পরে দেশের কয়েকটি কারাগারে বন্দীরা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেন। কারা অধিদপ্তর বলছে, সে সময় কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪০ জন বন্দী পালিয়ে যান। বিভিন্ন কারাগার থেকে লুট হয় ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল। পালানো বন্দীদের মধ্যে ৬৮৩ জনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। আর কারাগার থেকে লুট হওয়া ২০টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধরা না পড়া বন্দীদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও ৯ জন জঙ্গি। আর লুট হওয়া কিছু চায়নিজ রাইফেল ও শটগান এখনো উদ্ধার হয়নি। র‍্যাব ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাঝেমধ্যেই দু-একজন করে সাজাপ্রাপ্ত বন্দী গ্রেপ্তার করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের কারাগারগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। ধীরগতিতে হলেও মাঝেমধ্যে পুলিশের লুট হওয়া কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস)

লুট হওয়া অস্ত্র বিক্রিতে পুলিশ সদস্য

গত বছরের ৩ মার্চ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে দুজনের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা পিস্তলটি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া। হত্যার আগে ওই পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন নিহত ব্যক্তিদের একজন, তাঁর নাম নেজাম উদ্দিন। এতে স্থানীয় এক দোকানিসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন।

পরে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সুপার (এসপি) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ঘটনার দিন নেজাম সেখানে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে গুলি করেছিলেন। সাতকানিয়ার সেই অস্ত্র কেনাবেচায় পুলিশ কনস্টেবল মো. রিয়াদের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তাঁর বাড়ি সাতকানিয়ায়। তিনি চাঁদপুরে কর্মরত ছিলেন। ওই সূত্র ধরে ২১ মার্চ কনস্টেবল রিয়াদসহ ছয়জনকে নগরের পতেঙ্গা ও বাকলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও সাতটি গুলি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ ওই সময় জানায়, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া বিদেশি পিস্তলটিও লোহাগাড়া থানা থেকে লুট করা। গ্রেপ্তারের পর রিয়াদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি ও তাঁর দুই সহযোগী চট্টগ্রামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

একই বছরের ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া রানী রাশমণিঘাট এলাকা থেকে সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুম (২৮) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে একটি পিস্তল ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়।

সিএমপি জানায়, মাসুম নগরীর বড় একটি সন্ত্রাসী চক্রের প্রধান। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল। এই অস্ত্র ব্যবহার করে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ করতেন।

এ ছাড়া থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খুনখারাবি ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগে পুলিশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। এসব খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। ধীরগতিতে হলেও মাঝেমধ্যে পুলিশের লুট হওয়া কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন না তিনি।