
সাত দিন আগে ঢাকার ডেমরার বামৈল বালুর মাঠসংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনের পাশ থেকে ব্যবসায়ী ফিরোজ আলমের (৩৮) লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে নির্মাণাধীন ভবন থেকে লাফ দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ফিরোজ আত্মহত্যা করেছেন, এমনটা ধরেই চলছিল পুলিশের তদন্ত।
তবে নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শনের পর তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়, ফিরোজকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ভবন থেকে ফেলে দেন। ঘটনার এক সপ্তাহ পর নির্মাণাধীন ভবনের ঠিকাদার সেলিম হাওলাদারকে (৫৪) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরিয়ে আসে ফিরোজকে তিনি ভবন থেকে ফেলে হত্যা করেছেন। ফিরোজের স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় আট মাস ধরে সেলিমের অনৈতিক সম্পর্ক চলছিল। ফিরোজের স্ত্রীকে নিজের করে নিতেই সেলিম তাঁকে খুন করেন।
বরিশালের বিমানবন্দর থানার ভবানীপুর এলাকা থেকে গতকাল সেলিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আজ সোমবার সেলিম হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ফিরোজকে তিনি কীভাবে হত্যা করেছেন, কেন হত্যা করেছেন—এসব তথ্য তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। এর আগে ফিরোজের ভাই জাকির হোসেন গত শনিবার ডেমরা থানায় সেলিমকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ জানায়, ফিরোজ উত্তর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় খাবারের হোটেলের ব্যবসা করতেন। তাঁর স্ত্রী (২৫) হোটেলে থেকে ফিরোজকে সহায়তা করতেন। সাঁতারকুল এলাকায় ঠিকাদারির কাজ করার সময় হোটেলে খেতে আসতেন সেলিম। এক বছর ধরে ফিরোজ ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সেলিমের সুসম্পর্ক তৈরি হয়। একসময় সেলিমের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নেন ফিরোজ। এর সূত্র ধরে ফিরোজের বাসাতেও সেলিম যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে ফিরোজের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় সেলিমের।
জবানবন্দিতে সেলিম বলেছেন, তিন মাস আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান ফিরোজ। এই সময়ে ফিরোজের স্ত্রী ও দুই সন্তানের দেখভাল করতেন সেলিম। ১৫ ফেব্রুয়ারি ফিরোজ জামিনে মুক্ত হন। বিষয়টি সেলিম মেনে নিতে পারেননি। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ফিরোজকে বাধা মনে করে হত্যার পরিকল্পনা করেন সেলিম। গত ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বামৈল বালুর মাঠ এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে ফিরোজকে নিয়ে যান সেলিম। ভবনের চারতলা অথবা পাঁচতলা থেকে ফিরোজকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করেন সেলিম।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডেমরা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাস প্রথম আলোকে বলেন, ভবন থেকে ফেলে হত্যার পর সেলিম নিজেই প্রচার করেছিলেন ফিরোজ আত্মহত্যা করেছেন। তবে ভবনের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় স্বাভাবিকভাবে ফিরোজকে নিয়ে সেলিম ভবনে প্রবেশ করেছেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সেলিম বলেছিলেন থানায় এসে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি থানায় আসেননি।
পুলিশের ডেমরা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মধুসূদন দাস বলেন, সেলিমের লাশ নির্মাণাধীন ভবন থেকে খানিকটা দূরে পড়েছে। ওই ভবন থেকে লাফ দিলে দুই উপায়ে তাঁর লাশ এত দূরে যেতে পারে। একটি হলো তাঁকে খানিকটা দৌড়ে এসে লাফ দিতে হবে অথবা পেছন থেকে তাঁকে জোরে ধাক্কা দিতে হবে। কিন্তু নির্মাণাধীন ভবনের প্রতিটি তলা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ওপরের কোনো একটি তলার সিঁড়ির কাছ থেকে ফিরোজ নিচে পড়েছেন। সেখানে দৌড়ে এসে নিচে লাফ দেওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং কেউ তাঁকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই সেলিমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা মধুসূদন জানান, ফিরোজের স্ত্রীর কথাও অসংলগ্ন মনে হচ্ছিল। তিনি কখনো বলছিলেন, ফিরোজ আত্মহত্যা করেছেন আবার কখনো বলছিলেন সেলিম ফিরোজকে হত্যা করেছেন। ঘটনার দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ফিরোজের বাসাতেই ছিলেন সেলিম। বিকেলে সেলিমের সঙ্গেই বের হন ফিরোজ। এ কারণে সব সন্দেহই তৈরি হয় সেলিমকে ঘিরে। তা ছাড়া সেলিম নিজেকে ফিরোজের মামাতো ভাই বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। এসব কারণে সেলিমের প্রতি আরও বেশি সন্দেহ তৈরি হয়।