পিস্তল ঠেকিয়ে দুবাইফেরত ব্যক্তির সোনা ছিনতাইয়ে দুই পুলিশ

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

দুবাইফেরত এক যাত্রী ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর পথে একজন তাঁর মাইক্রোবাসের পথ আটকান। নিজেকে পুলিশ সদস্য পরিচয় দেন তিনি। এরপর দরজা খুললে ওই যাত্রীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আরেক সঙ্গীকে নিয়ে উঠে পড়েন মাইক্রোবাসে। গাড়ি থেকে যাত্রীর ভাইকে নামিয়ে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে সোনাসহ ২২ লাখ টাকার মালামাল লুটে নেন তাঁরা।

এক বছর তিন মাস আগের এই ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুজন পুলিশ কনস্টেবল। একজনের নাম মো. সুমন। তিনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) কর্মরত ছিলেন। অপরজন সালাউদ্দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) কর্মরত ছিলেন। বাকি তিন আসামি হলেন পুলিশ কনস্টেবল সালাউদ্দিনের সহযোগী তোফাজ্জল হায়দার, সৈয়দ আলী প্রামাণিক ও সাইফুল ইসলাম।

ডাকাতির ঘটনায় গত বছরের ২১ জুন রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন আবুল কালাম আজাদ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ সদস্য সুমন ও সালাহউদ্দিনের কাছ থেকে এই ডাকাতির ঘটনায় লুটে নেওয়া সোনাসহ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এই দুই পুলিশ সদস্য যে মাইক্রোবাস ভাড়া করে ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন, সেটির চালক রানা আহম্মেদ মামলার সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ডাকাতিতে ব্যবহার করা মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা হয়েছে।
ডাকাতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সুমন ও সালাউদ্দিনকে পুলিশের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে। তবে ডাকাতির মামলায় আদালত থেকে জামিনে মুক্ত আছেন সুমন ও সালাউদ্দিন।

ঘটনার বিস্তারিত

মামলার এজাহার ও পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের তথ্য বলছে, চাঁদপুরের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ গত বছরের ১৯ জুন দুবাই থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তখন সকাল ১০টা ২৭ মিনিট। সোনাসহ অন্য মালামালের শুল্ক পরিশোধ করে বাইরে আসেন তিনি। বিমানবন্দরের সামনে আগে থেকে ঠিক করা মাইক্রোবাসে ওঠেন আজাদ। পরে মালামালও ওঠানো হয়।

গাড়িতে করে তিনি যখন বিমানবন্দরের প্রধান সড়কে আসছিলেন, তখন সাদাপোশাক পরা এক ব্যক্তি গাড়ির গতি রোধ করেন। একপর্যায়ে আজাদ গাড়ির দরজা খোলেন। তখন পিস্তল ঠেকিয়ে গাড়ির ভেতরে উঠে পড়েন ডাকাত দলের দুই সদস্য। এই দুজন হলেন কনস্টেবল সালাউদ্দিন ও সুমন। পরে গাড়িতে থাকা আজাদের ভাই শাহাদাতকে জোর করে নামিয়ে আনেন ডাকাত দলের দুই সদস্য। তাঁরা শাহাদাতকে পেছনে থাকা তাঁদের ভাড়া করা মাইক্রোবাসে তোলেন। ওই গাড়িতে ডাকাত দলের তিন সদস্য তোফাজ্জল হায়দার, সৈয়দ আলী প্রামাণিক ও সাইফুল ইসলাম ছিলেন।

এ ঘটনা সম্পর্কে আজাদের গাড়িচালক বাবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডাকাত দলের এক সদস্য গাড়িতে ওঠার পরপরই আমার ও আজাদের মুঠোফোন কেড়ে নেয়। বলে, তারা পুলিশের লোক। একজন আজাদকে বলেছিল, “তুই চোরাকারবারি করিস। যা আছে তুই দিয়ে দে।” তখন মারধর করে স্বর্ণসহ সব ধরনের মালামাল লুট করে নেয়।’
বাবুল হোসেন আরও বলেন, গাড়ি যেন বিমানবন্দর থানার দিকে না নেওয়া হয়, সে জন্য তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। গাড়িটি কাওলায় পৌঁছালে আরেকটি গাড়ি দেখা যায়। আজাদের মালামাল লুটে নিয়ে তাঁরা ওই গাড়িতে উঠে পালিয়ে যান।

এ ঘটনার পর আবুল কালাম আজাদ বিমানবন্দরে কর্মরত আর্মড পুলিশের (এপিবিএন) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পাশাপাশি বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন তিনি। এপিবিএন বিমানবন্দর এলাকার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ কনস্টেবল সুমন ও সালাউদ্দিনের সংশ্লিষ্টতা পায়। পরে এপিবিএনের সদস্যরা সালাউদ্দিন ও সুমনের বাসায় অভিযান চালান। পুলিশ কনস্টেবল সালাউদ্দিনের বাসা থেকে সোনার বারসহ (৩২৯ গ্রাম) ২০ লাখ টাকার মালামাল জব্দ করা হয়। আর পুলিশ কনস্টেবল সুমনের বাসা থেকে জব্দ করা হয় লুটে নেওয়া ৩০ হাজার টাকা।

এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া এপিবিএনের তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, দুবাইফেরত আবুল কালাম আজাদের লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করা হয় দুই কনস্টেবলের বাসা থেকে। পরে এগুলো মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। অবশ্য পুলিশ কনস্টেবল সুমনের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামী ডাকাতির সঙ্গে জড়িত নন। তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডাকাত দলের সদস্য তোফাজ্জল হায়দারের বন্ধু হলেন পুলিশ কনস্টেবল সালাউদ্দিন। সুমন ও সালাউদ্দিন পূর্বপরিচিত। সেদিন তাঁরা রাজারবাগ থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে বিমানবন্দরে যান। সেদিন সালাউদ্দিনই আবুল কালাম আজাদের মাইক্রোবাসের গতি রোধ করেছিলেন। অপর কনস্টেবল সুমনও ডাকাতিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন।