ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে অবৈধ পথে লিবিয়ায় নিয়ে একজনকে জিম্মি করার ঘটনায় করা মামলায় মানব পাচার চক্রের এই দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ
ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে অবৈধ পথে লিবিয়ায় নিয়ে একজনকে জিম্মি করার ঘটনায় করা মামলায় মানব পাচার চক্রের এই দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ

১২ লাখ টাকা দিয়ে ইউরোপযাত্রা

দিল্লি, কলম্বো, শারজাহ, মিসরের মরুভূমি হয়ে লিবিয়ায় গিয়ে জিম্মি, পরে ফিরলেন শূন্য হাতে

ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি। পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে নেওয়া হয় মিসরে। সেখান থেকে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পেরিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে একটি কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। আদায় করা হয় চুক্তির টাকা। পরে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হলে মুক্তির জন্য পরিবারের কাছে আরও ছয় লাখ টাকা দাবি করেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা।

এ ঘটনায় করা মানব পাচারের মামলায় পাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর বিমানবন্দর থানার আশকোনা হজ ক্যাম্পের সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটের সামনে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. আতিকুর রহমান টমাস (৩২) ও মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলাল (৫৪)।

সিআইডি সূত্র জানায়, নোয়াখালীর সেনবাগের বাসিন্দা ওই যুবক প্রায় তিন বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফেরার পথে বিমানে এক সহযাত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি মানব পাচার চক্রের এক সদস্যের সঙ্গে পরিচিত হন। চক্রের সদস্যরা তাঁকে লিবিয়া হয়ে নিরাপদে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান। এ জন্য ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁকে ইতালি পাঠানোর চুক্তি করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল ঢাকার আশকোনার একটি অফিসে পাসপোর্ট জমা দেন ওই যুবক। তখন তিনি অগ্রিম ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন। ৭ এপ্রিল তাঁকে প্রথমে ভারতের নয়াদিল্লি এবং সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় ১৬ দিন অবস্থানের পর বিভিন্ন অজুহাতে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে আরও টাকা নেওয়া হয়। এরপর শারজাহ হয়ে তাঁকে পাঠানো হয় মিসরের কায়রোতে।

কায়রো থেকে লিবিয়ায়, ‘গেম রুমে’ নির্যাতন

অভিযোগ অনুযায়ী, কায়রো বিমানবন্দর থেকে চক্রের এক সদস্য ওই যুবককে একটি বাসায় নিয়ে প্রায় পাঁচ দিন আটকে রাখেন। পরে আগের চুক্তির কথা বলে তাঁর কাছে আরও ছয় হাজার মার্কিন ডলার দাবি করা হয়। ওই অর্থও নেওয়া হয়। এভাবে নগদ টাকা, বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে যুবক ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে মোট ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

এরপর তাঁকে গাড়িতে করে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পেরিয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে চক্রের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে একটি কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রাখেন। সেখানে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে অন্যদের সঙ্গে ওই যুবককেও আটক করে কারাগারে পাঠায়। সেখানেও তাঁকে মুক্ত করার কথা বলে পরিবারের কাছে আরও ছয় লাখ টাকা দাবি করা হয়।

পরবর্তী সময়ে লিবিয়া পুলিশ তাঁকে গত ৭ জুলাই বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফিরে তিনি বাদী হয়ে ৫ অক্টোবর বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর সিআইডি তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে অভিযান চালিয়ে আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে।