গ্রামীণ নারীরা রান্নাঘরে একদিনে গড়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় কাটান
গ্রামীণ নারীরা রান্নাঘরে একদিনে গড়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় কাটান

গবেষণার তথ্য

লাকড়ি, পাতা দিয়ে রান্নাকারী ২৩ শতাংশ নারী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন

দেশের গ্রামের মাঝবয়সী নারীদের সারা দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিট রান্না ঘরে কাটে। এ সময় তাঁদের বড় অংশের রান্নার কাজ হয় লাকড়ি, তুষ, শুকনা গোবর ও শুকনা পাতায়। আর এতে যে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, তা মূলত রান্নাঘরেই ঘুরপাক খায়। নিশ্বাসের সঙ্গে ওই ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে এভাবে রান্নাকারী নারীদের ২৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। গ্যাস বা বিদ্যুৎ (কম দূষণ হয় এমন জ্বালানি) দিয়ে রান্না করা নারীদের তুলনায় ওই নারীদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ বেশি।

দেশের বেশির ভাগ গ্রামীণ পরিবারের রান্নায় কাঠ ও গোবরের মতো জৈব জ্বালানি ব্যবহার হয়। এসব জৈব জ্বালানি ব্যবহারের ফলে প্রচুর পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা ও কার্বন মনো–অক্সাইড তৈরি হয়; যা নারীদের উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে
শাখাওয়াত হোসেন, গবেষণা দলের প্রধান ও শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘আমেরিকান জার্নাল অব হিউম্যান বায়োলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন গবেষক যৌথভাবে গবেষণাটি করেছেন। ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে রান্নার জ্বালানি ব্যবহারের সম্পর্ক’ শীর্ষক গবেষণাটিতে উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও নারীরা আরও নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের শিক্ষক মো. শাখাওয়াত হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ গ্রামীণ পরিবারের রান্নাঘরে কাঠ ও গোবরের মতো জৈব জ্বালানি ব্যবহার হয়। শুধু কিছু শহর ও মফস্‌সলে আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ দিয়ে রান্না হতে দেখি। এসব জৈব জ্বালানি ব্যবহারের ফলে প্রচুর পরিমাণে অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম–২.৫ এবং কার্বন মনো–অক্সাইড তৈরি হয়; যা নারীদের উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।’

আমাদের দেশের গ্রামীণ রান্নাঘরগুলোতে জৈব জ্বালানির কারণে ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ তৈরি হয়, এটা যেমন একটা দিক; অন্যদিকে রান্নাঘরগুলো থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার জায়গাও কম রাখা হয়। ফলে নারীদের বেশি সময় ধরে ও বেশি পরিমাণে বায়ুদূষণের মধ্যে থাকতে হয়
আবদুস সালাম, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গবেষণায় সাভার ও নওগাঁর ২ হাজার ১৮২ জন নারীর উচ্চ রক্তচাপ মাপা হয়। তাঁদের মধ্যে ৯৪৬ জন নারী গ্যাস-বিদ্যুৎ দিয়ে রান্না করেন, আর ১ হাজার ২৩৬ জন নারী রান্না করেন জৈব জ্বালানি দিয়ে। দেখা গেছে, একজন নারী টানা এক ঘণ্টার বেশি ধোঁয়াযুক্ত রান্নাঘরে অবস্থান করলে তাঁর উচ্চ রক্তচাপ বাড়তে থাকে। সকাল, দুপুর ও রাত মিলিয়ে গড়ে একেকজন নারী ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিট রান্নাঘরে ব্যয় করেন। এতে রক্তচাপ বাড়ার পাশাপাশি মেজাজ খিটখিটে থাকা, হঠাৎ রেগে যাওয়া, চোখ জ্বালাপোড়া করা ও ডায়াবেটিসের সমস্যা তৈরি হয়।

জরিপে অংশ নেওয়া অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা তুলনামূলক কম। যাঁদের সমস্যা আছে, তাঁদের মধ্যে ২৮ শতাংশ নারীর বয়স ১৮ বছরের নিচে, ১৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছর এবং ৪৫ শতাংশের বয়স ৩৬ বছর ও তার বেশি।

* গ্রামীণ নারীরা তিন ঘণ্টার বেশি সময় রান্নাঘরে থাকেন* ৩৬ বছরের বেশি নারীদের আক্রান্তের হার বেশি* গ্যাস–বিদ্যুতে রান্নাকারী নারীদের আক্রান্তের হার কম

গবেষণায় দেখা যায়, জৈব জ্বালানি ব্যবহারকারী নারীদের ২৩ শতাংশ এবং গ্যাস–বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ১৮ শতাংশ  উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের গড় বয়স ৩৭ বছর। তাঁদের সবাই পরিবারের সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি রান্নার কাজও করে থাকেন। রান্নার কাজে নারীরা মোট আট ধরনের জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে। সেগুলো হলো গাছের কাঠ, লাকড়ি–ডালপালা, ধানের তুষ, শুকনা পাতা, গোবর, পাটখড়ি, খড় এবং পাটখড়ির ওপর শুকনা গোবরের প্রলেপ দিয়ে তৈরি বিশেষ জ্বালানি।

গবেষণাটিতে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব উল্লেখ করে বলা হয়, দেশের ৯৪ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের রান্নার কাজে জৈব জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। আর শহরের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ শহুরে পরিবারে জৈব জ্বালানি দিয়ে রান্না করা হয়। আর বিশ্বের ৩০০ কোটি মানুষ জৈব জ্বালানি দিয়ে রান্না করে; যা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর তৃতীয় বৃহত্তম কারণ বলে মনে করা হয়।

গবেষণায় সাভার ও নওগাঁর ২ হাজার ১৮২ জন নারীর উচ্চ রক্তচাপ মাপা হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ দিয়ে রান্না করেন এমন ৯৪৬ জন নারী এবং জৈব জ্বালানি দিয়ে রান্না করেন এমন ১ হাজার ২৩৬ জন নারীর ওপর জরিপটি করা হয়। রান্নার সময় ও পরে দিনের বিভিন্ন সময়ে ওই রক্তচাপ মাপার যন্ত্র দিয়ে তা মাপা হয়।

প্রতিবেদনে পরামর্শ হিসেবে জৈব জ্বালানি থেকে সরে এসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ দিয়ে রান্না করার জন্য বলা হয়েছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, সারা বছরের হিসাব ধরলে জৈব জ্বালানির খরচের পরিমাণ গ্যাস ও বিদ্যুতের চেয়ে বেশি। আর এর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও রোগবালাইয়ের চিকিৎসা ব্যয় যোগ করলে ওই খরচ প্রায় দ্বিগুণ।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুদূষণ গবেষক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের গ্রামীণ রান্নাঘরগুলোতে জৈব জ্বালানির কারণে ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ তৈরি হয়, এটা যেমন একটা দিক; অন্যদিকে রান্নাঘরগুলো থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার জায়গাও কম রাখা হয়। যে কারণে ধোঁয়া বেশি সময় ধরে রান্নাঘরে আটকে থাকে। ফলে নারীরা বেশি সময় ধরে এবং বেশি পরিমাণে বায়ুদূষণের মধ্যে থাকেন। তাই জৈব জ্বালানি থেকে সরে আসার পাশাপাশি রান্নাঘরের ধোঁয়া বের হওয়ার জায়গা রাখা জরুরি।’