বোনের করা প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগের একটি মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান এবং তাঁর মা ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমানসহ ছয়জনকে অব্যাহতির আদেশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আজ সোমবার গুলশান থানার এই মামলায় শুনানি নিয়ে তাঁদের অব্যাহতির আদেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে সিমিন রহমান, শাহনাজ রহমানসহ ট্রান্সকম গ্রুপের অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাযরেহ্ হকের দায়ের করা চারটি মামলার সব কটি থেকে তাঁরা অব্যাহতি পেলেন।
গুলশান থানার ২০(০২)২৪ নম্বর মামলায় আজ আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন মঞ্জুর করেন। অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, শেয়ার হস্তান্তর জালিয়াতির মামলায় শেয়ার হস্তান্তর দলিল ফরম-১১৭ উদ্ধার বা কোনো রূপ বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা ছাড়াই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ২০২৩ সালের ছাপানো কিছু স্ট্যাম্পকে এই মামলার শেয়ার হস্তান্তর-সংক্রান্ত এফিডেভিট বিবেচনায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। কিন্তু মামলায় ওই সব শেয়ার ২০২০ সালে পরিপূর্ণভাবে হস্তান্তর হয়েছে এবং ২০২০ সালেই রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) কর্তৃক গৃহীত হয়। ২০২৩ সালে সরবরাহ করা স্ট্যাম্প তার আগের সময়ে ব্যবহার করা অসম্ভব অর্থাৎ স্ট্যাম্প ছাপানোর আগের সময়ে তার ব্যবহার সম্ভব নয়। আদালত অভিযোগ গঠনের কোনো উপাদান না থাকায় বিবাদীদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।
ট্রান্সকম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সিইও ছিলেন লতিফুর রহমান। তিনি জীবদ্দশায় তাঁর অবর্তমানে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা এবং তাঁর নিজস্ব শেয়ারের বণ্টন-সংক্রান্ত ২০২০ সালের ১২ জুন একটি ডিড অব সেটেলমেন্ট (সমঝোতা দলিল) সম্পাদন করেন। তাতে লতিফুর রহমান ছাড়াও তাঁর পরিবারের সব সদস্য অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী শাহনাজ রহমান, বড় মেয়ে সিমিন রহমান, ছোট মেয়ে শাযরেহ্ হক ও ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ওই সমঝোতা দলিলের সব শর্ত মেনে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর দেন। পরে তা কোম্পানির বোর্ড সভায় অনুমোদিত হয়। সমঝোতা দলিল সম্পাদনের পর লতিফুর রহমান রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) কর্তৃক প্রণীত শেয়ার হস্তান্তর-সংক্রান্ত ফরম-১১৭ স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাঁর নিজের মালিকানাধীন কোম্পানি ট্রান্সকম লিমিটেডের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার তাঁর বড় মেয়ে সিমিন রহমান, ৪ হাজার ৭২০টি শেয়ার তাঁর ছোট মেয়ে শাযরেহ্ হক এবং ৪ হাজার ৭২০টি শেয়ার ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের বরাবরে হস্তান্তর করেছেন। পরবর্তী সময়ে ওই ফরম-১১৭ গুলো আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হলে আরজেএসসি কর্তৃক যথারীতি শেয়ার হালনাগাদপূর্বক শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারসংখ্যা-সংবলিত শিডিউল-১০ ইস্যু করা হয়। লতিফুর রহমান ২০২০ সালের ১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর দীর্ঘ প্রায় চার বছর কোম্পানি খুব সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। লতিফুর রহমানের দুই কন্যা সিমিন রহমান, শাযরেহ্ হক এবং এক ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ করবর্ষে তাঁদের ব্যক্তিগত ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নে (আয়কর বিবরণী) ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ার থেকে তাঁদের বরাবর হস্তান্তরিত শেয়ার প্রদর্শনও করেন।
লতিফুর রহমানের মৃত্যুর প্রায় চার বছর পর ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁর কন্যা শাযরেহ্ হক কোম্পানির কর্ণধার সিমিন রহমান এবং তাঁর মা শাহনাজ রহমান চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে গুলশান থানায় প্রায় একই অভিযোগ ও একই ধারায় তিনটি মামলা দায়ের করেন, যা গুলশান থানার মামলা নম্বর ২০(০২)২৪, ২১(০২)২৪ ও ২২(০২)২৪। এসব মামলার কারণে সিমিন রহমান ও তাঁর মা বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাঁরা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করে ২০২৪ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পান। সিমিন রহমানের বাংলাদেশে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে শাযরেহ্ হক একই দিন দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২২ মার্চ লতিফুর রহমানের ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের ৯ মাস আগের স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিমিন রহমান ও অন্যদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। গুলশান থানার ১৯(০৩)২৪ নম্বর হত্যা মামলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে কোনো ধরনের সঠিকতা না পেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে আদালত সেটি গ্রহণ করে সিমিন রহমানসহ অন্যদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।
অপর মামলাগুলোও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। এর মধ্যে ২২(০২)২৪ নম্বর মামলায় অভিযোগ ছিল, লতিফুর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ রহমান স্বামীর মৃত্যুর পর নমিনি হিসেবে লতিফুর রহমানের টাকা উত্তোলন করে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের ৯ হাজার শেয়ার কেনেন। ওই মামলা পিবিআই তদন্ত শেষে টাকা উত্তোলন এবং ৯ হাজার শেয়ার কেনায় কোনো অনিয়ম না থাকায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, যা পরবর্তী সময়ে আদালত গ্রহণ করে বিবাদীদের অব্যাহতি দেন।
লতিফুর রহমানের সম্পাদিত ডিড অব সেটেলমেন্ট জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে দাবি করে দায়ের করা ২১(০২)২৪ নম্বর মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ডিড অব সেটেলমেন্ট এবং যে সভায় সেটি অনুমোদিত হয়, তার কাগজপত্র জব্দ করে সিআইডি কর্তৃক বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করান। ওই বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার মতামত অনুসারে ডিড অব সেটেলমেন্ট এবং বোর্ড সভায় লতিফুর রহমান, তাঁর ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান এমনকি বাদী শাযরেহ্ হকের স্বাক্ষর সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়। এর ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। আদালত তা গ্রহণ করে বিবাদীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।
আজকে ২০(০২)২৪ নম্বর মামলায় অব্যাহতির আদেশের মাধ্যমে সিমিন রহমান, তাঁর মা শাহনাজ রহমানসহ ট্রান্সকম গ্রুপের অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাযরেহ্ হকের দায়ের করা চারটি মামলা থেকেই তাঁরা অব্যাহতি পেলেন।