৯০তম জন্মবার্ষিকী

মুর্তজা বশীরের আত্মপ্রতিকৃতি ও সংগ্রহশালার উন্মোচন

প্রয়াত শিল্পীর ফার্মগেটের বাসায় দুই মেয়ে মুনীরা বশীর ও মুনিজা বশীরের সহযোগিতায় সংগ্রহ ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করে মুর্তজা বশীর ট্রাস্ট।

বাবার আত্মপ্রতিকৃতির সামনে মুনিজা বশীর ও মুনীরা বশীর
ছবি: প্রথম আলো

শিল্পী মুর্তজা বশীর ছিলেন একজন গোছানো মানুষ। শিল্পী ও সংগ্রাহক হিসেবে তাঁর সংরক্ষণচেতনা ছিল প্রবল। নিজের আলোকচিত্র, নিজ হাতে তোলা আলোকচিত্র, নিজের আঁকা ছবি, আত্মপ্রতিকৃতি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র পরম যত্নে সংরক্ষণ করেছেন তিনি। কারণ, তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তাঁকে নিয়ে একদিন গবেষণা হবে। ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে শিল্পীর সেই সংগ্রহশালার একাংশ সবার জন্য উন্মুক্ত করল তাঁর পরিবার ও মুর্তজা বশীর ট্রাস্ট।

গতকাল বুধবার ছিল মুর্তজা বশীরের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁর বাসায় দুই মেয়ে মুনীরা বশীর ও মুনিজা বশীরের সহযোগিতায় সংগ্রহ ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করে মুর্তজা বশীর ট্রাস্ট। প্রদর্শনীতে রাখা শিল্পীর বিভিন্ন সময়ের ১২০টি আত্মপ্রতিকৃতি বলে দিচ্ছিল, নিজের প্রতি কী ভীষণ যত্নবান ছিলেন বশীর। ভেতরের ঘরে রয়েছে নিজ হাতে আঁকা স্ত্রীর ১২টি পোর্ট্রেট। পাথরের ভাস্কর্য, ফ্রেমবন্দী রঙের প্যালেট ছাড়াও দর্শনার্থীদের জন্য মেলে রাখা হয়েছিল তাঁর লেখা বই, সংগৃহীত স্ট্যাম্প, মুদ্রা, প্রাচীন পুঁথি। তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার, খাট, বইয়ের তাক, জায়নামাজে এখনো যেন মূর্ত শিল্পী মুর্তজা বশীর।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল—বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে এ অঞ্চলের কবি ও শিল্পীদের অবদান অনেক। মুর্তজা বশীর তাঁদের অন্যতম। তিনি এ অঞ্চলের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বিশিষ্টজনদেরও অন্যতম। তাঁর নিজের বিচিত্র সব সংগ্রহ নিয়ে আলাদা প্রদর্শনী করা যেতে পারে। বাবা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌কে নিয়ে মুর্তজা বশীরের চমৎকার লেখা, স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা, তাঁকে সময় দেওয়া অন্য রকম একটি ব্যাপার।

মুর্তজা বশীরের জন্মদিনে (বাঁ থেকে) মাহবুবুর রহমান, উম্মে কুলসুম, গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী, মুনীরা বশীর, মুনিজা বশীর, লুভা নাহিদ চৌধুরী ও নাসির আলী মামুন। গতকাল রাজধানীর মণিপুরিপাড়ায় তাঁর নিজ বাসভবনে

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘মুর্তজা চাচাকে ছোটবেলা থেকে চিনি বাবার বন্ধু হিসেবে। কিন্তু তিনি কত বড়মাপের শিল্পী ছিলেন, তখনো সেটা বুঝিনি। বাবার একটা বই তাঁকে উৎসর্গ করেছেন। চাচার আঁকা ছবিও আমাদের বাসায় আছে। চাচার সবচেয়ে চমৎকার দিকটি হচ্ছে, তিনি জীবনে যেসব করতে চেয়েছিলেন, তিনি সেগুলো করে গেছেন।’

আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন বলেন, ‘মুর্তজা বশীর প্রয়াত হননি। তিনি এই বাড়ির দেয়ালে, কার্নিশে, নিজের পোর্ট্রেটের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে আছেন। আমাদের এখানকার গুণী মানুষেরা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সবকিছু নিয়ে চলে যান। মুর্তজা বশীর ব্যতিক্রম। তিনি সবকিছু গুছিয়ে রেখে গেছেন।’

এইচএসবিসি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, মুর্তজা বশীরের মৃত্যুর পর বেঁচে থাকার যে অন্বেষণ ছিল, তাতে তিনি সফল হয়েছেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান, আইভি জামান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী, শিল্পীর পারিবারিক বন্ধু প্রয়াত ভাস্কর আবদুল্লাহ খালিদের স্ত্রী উম্মে কুলসুম, শিল্পী নাজিয়া আন্দালিব, বাংলাদেশ ম্যাচবক্স কালেক্টরস ক্লাবের সভাপতি সাকিল হক প্রমুখ।

মুর্তজা বশীরের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মেয়ে সালিমা হাশমির একটি বার্তা পড়ে শোনান মুনিজা বশীর। তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এ আয়োজন করা হলেও এটি মূলত মুর্তজা বশীর ট্রাস্টের আয়োজন। তাঁদের ভাই মেহরাজ বশীর দেশে ফিরলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ট্রাস্ট যাত্রা শুরু করবে। তখন সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সর্বসাধারণের জন্য এই সংগ্রহশালা খুলে দেওয়া হবে। ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুর্তজা বশীরের ছবিসংবলিত একটি স্মারক খামও প্রকাশ করা হয়েছে।

শিল্পী মুর্তজা বশীর ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট তিনি মারা যান।